‘নিজেকে কোনো একটি ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না’

শৈশবে জামালপুরের গ্রামের লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল সাইফ শুভর সংগীতযাত্রা। ২০০৬ সাল থেকে দীর্ঘ দুই দশকের পথচলায় তিনি কাজ করেছেন আধুনিক, ফোক, মডার্ন ফোক, মেলোডি ও রক মেলোডিসহ নানা ধারায়। গানের পাশাপাশি ফটোগ্রাফি ও ভিডিও নির্মাণেও রয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতা। নিজের জীবনের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন ‘প্রেম বিরহ’ মিউজিক ভিডিও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা গানকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্নও দেখেন এই শিল্পী। সম্প্রতি নিজের জেলা জামালপুরে রক ফেস্টের মঞ্চে শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতজীবনে যোগ করেছে বিশেষ এক অধ্যায়। ভবিষ্যতে একটি ফ্রি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর। সংগীতযাত্রা, ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি-এর সঙ্গে কথা বলেছেন সাইফ শুভ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহ-সম্পাদক তানজিদ শুভ্র…
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় জামালপুরের গ্রামে লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় গান গাওয়া থেকে আপনার সংগীতযাত্রার শুরু। সেই ছোট্ট শুভর সঙ্গে আজকের শিল্পী সাইফ শুভর সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায়?
সাইফ শুভ: পার্থক্যটা সময়ের, পরিণত হওয়ার প্রচেষ্টার। ২০০৬ থেকে এই ২০ বছরের সংগীতযাত্রায় অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। সংগীত সম্পর্কে জেনেছি, অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্যে এসেছি এবং ভালো কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
ছোট্ট শুভ থেকে আজকের সাইফ শুভ হয়ে ওঠার পথে এই শেখার সুযোগগুলোই আমার কাছে সবচেয়ে দামি। এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে জাতীয় শিশু শিল্পী প্রতিযোগিতায় লোকগীতি বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন আপনার ক্যারিয়ারে কী ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল?
সাইফ শুভ: সারা বাংলাদেশের মধ্যে লোকগীতি বিভাগে প্রথম হয়েছিলাম। অনেক গুণীজনের প্রশংসা ও দোয়া পেয়েছিলাম। তখন থেকেই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, চেষ্টা করলে ভালো কিছু করা সম্ভব।
এরপরের যাত্রাটা তো আপনাদের সামনেই। সেই ছোট্ট শুভ থেকেই আজকের সাইফ শুভ হয়ে ওঠা।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: আধুনিক, ফোক, মডার্ন ফোক, মেলোডি থেকে রক মেলোডি, বিভিন্ন ধারায় গান করেছেন। নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন অনুভব করেছেন?
সাইফ শুভ: সব ধরনের গান গাইতে পারা একজন সংগীতশিল্পীর জন্য ঈশ্বরপ্রদত্ত বিশেষ গুণ বলে মনে করি। আমি স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি আমাকে সেই সক্ষমতা দিয়েছেন।
তাই নিজেকে কোনো একটি ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের গান গাইতে চাই।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: ‘প্রেম বিরহ’-এর মিউজিক ভিডিওতে সত্য ঘটনা অবলম্বনের পাশাপাশি আপনি নিজেই নির্দেশনা দিয়েছেন। গায়ক থেকে পরিচালক হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাইফ শুভ: ছোটবেলা থেকেই গান গাওয়ার পাশাপাশি ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। প্রথমে প্রকৃতির ছবি তুলতাম, পরে বিভিন্ন মডেলের ছবি তুলেছি। দেশের একটি সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ফটোগ্রাফার হিসেবেও ছয় বছর কাজ করেছি।
সেখান থেকেই ভিডিও নির্মাণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ‘প্রেম বিরহ’ সেই আগ্রহেরই একটি প্রকাশ। কাজটি করতে গিয়ে অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, মিউজিক ভিডিওটির গল্প আমার নিজের জীবনের বাস্তব ঘটনা থেকে নেওয়া।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: দ্রুতগতির ডিজিটাল সময়ে একজন শিল্পী কীভাবে নিজের কাজের মান ধরে রাখতে পারেন?
সাইফ শুভ: গান মূলত শোনার বিষয়, অনুভবের বিষয়। তবে সময়ের সঙ্গে গান এখন দেখার বিষয়ও হয়ে উঠেছে। অসংখ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি হওয়ায় নতুন ও পুরোনো সব শিল্পীর জন্যই কাজের সুযোগ বেড়েছে।
তবে প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করে, সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। নতুনদের শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের প্রতিভার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। প্রযুক্তি ও প্রতিভা দুটোকেই সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই কাজের মান ধরে রাখা সম্ভব।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কী? নতুন শিল্পীদের জন্য কেমন পরিবেশ চান?
সাইফ শুভ: বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন নতুনদের জন্য উন্মুক্ত থাকুক, এটাই আমার প্রধান প্রত্যাশা। সংগীতের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন শিল্পীদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়া দরকার।
প্রকৃতিতে নতুন ফুল, ফল ও গাছপালা যেমন সৌন্দর্য বাড়ায়, তেমনি নতুন শিল্পী ও নতুন গানও সংগীতাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে। অসংখ্য নতুন কাজ আসুক, আমাদের সংগীতাঙ্গন সবসময় আলোকিত থাকুক, এটাই প্রত্যাশা।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: আপনি একসময় বলেছিলেন, শুদ্ধ ধারার বাংলা গানকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে চান। সেই স্বপ্নের জায়গায় নিজেকে কতটা এগিয়ে মনে হয়?
সাইফ শুভ: গত বছর দেশের বাইরে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। এ বছরও দেশের বাইরে আরও কিছু অনুষ্ঠানের কথা চলছে। দেশের বাইরে বাংলা গানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অনুভূতি সত্যিই আলাদা।
নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের সংস্কৃতি ও বাংলা গানকে যতটা সম্ভব অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা সবসময়ই করে যাচ্ছি। শুদ্ধ ধারার বাংলা গানের শ্রোতারা পাশে থাকলে আগামীতেও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: জামালপুর আপনার শিকড়। জামালপুর রক ফেস্টে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাইফ শুভ: ২০০০ সালে জামালপুরে প্রথম রক ফেস্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কুমার বিশ্বজিৎ, কানিজ সুবর্ণা ও নগর বাউল জেমস পারফর্ম করেছিলেন। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। বাবা-মায়ের সঙ্গে দর্শকসারির তৃতীয় সারিতে বসে সেই অনুষ্ঠান দেখেছিলাম। আজও সেই স্মৃতি আমার কাছে উজ্জ্বল।
দীর্ঘ দুই যুগ পর এ বছর দ্বিতীয়বার জামালপুরে রক ফেস্ট হলো। এবার আমি, নোবেলসহ আরও পাঁচটি ব্যান্ড পারফর্ম করেছি।
অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যে আয়োজনে একসময় শিশু হিসেবে দর্শকসারিতে বসেছিলাম, একই আয়োজনের দ্বিতীয় আসরে শিল্পী হিসেবে নিজের জেলার মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। এমন সৌভাগ্য সত্যিই কজনের হয়!
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: আপনি বলেছিলেন, মানুষের কঠিন সময় পার হতে এবং ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যও গান করেন। এই দর্শনটি কি এখনো একই আছে?
সাইফ শুভ: শতভাগ আছে। সংগীত এমন একটি শক্তি, যা মানুষকে সুন্দর ও সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারে। এটি মানুষকে সংঘাত থেকে দূরে রাখে এবং সমৃদ্ধির পথ দেখায়।
আমি সবসময় সাধারণ মানুষের শিল্পী হতে চেয়েছি। তাঁদের অনুভূতি ও মনের কথাগুলো গানের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা আমার মধ্যে সবসময়ই থাকবে।
নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি: দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এখনো যে স্বপ্নটি পূরণ হয়নি, সেটি কী?
সাইফ শুভ: সত্যি বলতে, আমি একজন আত্মতুষ্ট মানুষ। জীবনে পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ পুষে রাখিনি। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই। তবে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানকে আমি সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করি।
তারপরও একটি স্বপ্ন আছে। একটি ফ্রি গানের স্কুল করতে চাই, যেখানে শুরু থেকে পদ্ধতিগতভাবে সংগীত শিক্ষা দেওয়া হবে এবং সবাই শুদ্ধ সংগীতচর্চার সুযোগ পাবে।
সেই স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চলছে। সবার আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে আশা করি, একদিন তা বাস্তবায়ন করতে পারব।
শুভ্র/