শৈবালের অজানা জগৎ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
পুকুরের পানিতে ভাসমান সবুজ আস্তরণ দেখলে অনেকেই বিরক্ত হন। কেউ একে ময়লা মনে করেন, আবার কেউ ভাবেন এটি কোনো অপ্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদ। অথচ এই ছোট্ট সবুজ স্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীবগোষ্ঠী শৈবাল। খালি চোখে অনেক শৈবাল দেখা যায় না, কিন্তু তাদের অবদান ছাড়া পৃথিবীর প্রাণজগতের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। শৈবালের সবচেয়ে বড় অবদান অক্সিজেন উৎপাদনে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের প্রায় ৫০-৮০ শতাংশই আসে সামুদ্রিক শৈবাল ও ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন থেকে। সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শৈবাল কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন নিঃসরণ করে। তাই বিজ্ঞানীরা শৈবালকে পৃথিবীর “নীরব অক্সিজেন কারখানা” বলেন। জলজ খাদ্যশৃঙ্খলেরও ভিত্তি গড়ে তোলে এই শৈবাল। শৈবাল না থাকলে মাছসহ সমগ্র জলজ বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ত।
বিজ্ঞান ও শিল্পক্ষেত্রেও শৈবালের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। স্পিরুলিনা ও ক্লোরেলা প্রোটিন ও ভিটামিনের উৎস হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। শৈবাল থেকে তৈরি আগার, অ্যালজিনেট ও ক্যারাজিনান খাদ্যশিল্প, ওষুধ ও প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় শৈবালকে নবায়নযোগ্য জৈবজ্বালানির সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটকালে শৈবালের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। দূষিত পানি পরিশোধনেও নির্দিষ্ট কিছু শৈবাল ব্যবহারের গবেষণা চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের নদী, হাওর, বিল ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলদূষণ, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জীবগোষ্ঠী আজ হুমকির মুখে।
শৈবাল সংরক্ষণ মানে শুধু একটি অণুজীবকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমরা বিশাল বন বা শতবর্ষী বৃক্ষের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, কিন্তু এই ক্ষুদ্র সবুজ প্রাণীগুলোর কথা ভাবি না। অথচ তাদের নীরব কর্মযজ্ঞের ফলেই প্রাণের চক্র অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশকে ভালোবাসতে হলে এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শৈবালের প্রতি সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ পৃথিবীর অনেক বড় পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে এই ক্ষুদ্র, নীরব অথচ বিস্ময়কর সবুজ জীবেরা।
লেখক: সুমনা আক্তার, শিক্ষার্থী (উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ), মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।