রুহিয়ার মাটিতে বিদেশি ফল ‘আনারকলি’ চাষে সফল সেনাসদস্য রিমুন

সবুজ লতাপাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে বিদেশি ফল ‘আনারকলি’। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, স্বাদেও তেমনি টক-মিষ্টি অনন্য। সমতল ভূমিতে অপ্রচলিত এই ফলের সফল চাষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় চমক সৃষ্টি করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও সেনাসদস্য রিমুন।
উপজেলার মণ্ডলাদাম গ্রামের এই যুবক বাড়ির আঙিনার অব্যবহৃত জমিতে শখের বশে আনারকলির চাষ শুরু করেছিলেন। পরীক্ষামূলক সে বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে প্রায় ৫০টি লতাগাছ। প্রথমবারেই আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়ায় আগামীতে বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে এই ফল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাঁর এই সফলতা দেখে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছেন এলাকাবাসী।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই প্যাশন ফ্রুট বাংলাদেশে ‘আনারকলি’ বা ‘ট্যাং ফল’ নামে পরিচিত। দেশের পাহাড়ী কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল যেমন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এর বিস্তার বেশি হলেও, রুহিয়ার মতো সমতল এলাকার মাটিতে এর আশাব্যাঞ্জক ফলন স্থানীয়দের মাঝে বেশ কৌতূহল ও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
নিজের এই সফলতার পেছনের গল্প জানিয়ে রিমুন বলেন, ২০২৫ সালে কক্সবাজার ভ্রমণের সময় প্রথম আনারকলি ফল দেখে এর স্বাদে মুগ্ধ হই। সেখান থেকেই এটি নিজ এলাকায় চাষ করার ইচ্ছে জাগে। পরে ২০২৬ সালে সেখান থেকে ৩টি জাতের ৫টি চারা সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসি। প্রথমে বসতবাড়ির ফাঁকা জায়গায় রোপণ করি। সেখানে গাছ বাড়ার পর বাড়ির পাশের সড়কসংলগ্ন জমিতে আরও কিছু চারা লাগাই। সেই ৫টি চারা থেকে এখন আমার বাগানে গাছের সংখ্যা অর্ধশত। বর্তমানে গাছে প্রচুর ফল এসেছে, যার স্বাদও বেশ সুস্বাদু।
তিনি আরও জানান, পরিচর্যা ঠিকঠাক থাকলে একেকটি গাছ থেকে বছরে এক থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত ফল আহরণ সম্ভব। “উত্তরাঞ্চলে এই ফলের সহজলভ্যতা নেই বললেই চলে। তবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাজারে প্রতি পিস আনারকলি ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং প্রতি কেজি প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আগামী মৌসুমে ১০ থেকে ২০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারকলির বাগান গড়ে তোলার জন্য জমি প্রস্তুত করছি।”
গাছে নতুন ফলের সমারোহ দেখতে প্রতিদিন রিমুনের বাগানে ভিড় করছেন উৎসুক স্থানীয়রা। অনেকে ফলটি দেখে ও খেয়ে নিজেদের বাড়িতেও আনারকলি চাষের আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
রামনাথ হাট এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সাইমুম পারভেজ বলেন, “আমাদের এলাকায় এই ফল আগে কখনো দেখিনি। প্রথমবার খেয়ে দেখলাম, স্বাদ বেশ চমৎকার। রিমুনের উদ্যোগটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি, নিজের বাড়িতেও কয়েকটি চারা রোপণের ইচ্ছে আছে।”
অন্য এক স্থানীয় প্রতিবেশী বলেন, “নতুন এই ফলের চাষ আমাদের এলাকায় আনন্দ ও প্রেরণা জোগাচ্ছ। তরুণরা বেকার বসে না থেকে এভাবে আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় কৃষিতে এগিয়ে এলে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। রিমুন যদি ফল বিক্রির পাশাপাশি চারা তৈরি করে ছড়িয়ে দেন, তবে এলাকার আরও অনেকে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
এ বিষয়ে রুহিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসিরুল আলম বলেন, “সাধারণত পাহাড়ি বা উপকূলীয় অঞ্চলে আনারকলি বেশি জন্মায়। সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে রুহিয়ার মণ্ডলাদামে সেনাসদস্য রিমুনের এই সফল চাষের বিষয়টি জানতে পেরেছি। শিগগিরই বাগানটি পরিদর্শনে গিয়ে চাষাবাদ সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হবে। পাশাপাশি এই নতুন ফল চাষ সম্প্রসারণে উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে চাষীকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”
উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে সেনাসদস্য রিমুনের এই ব্যতিক্রমী আনারকলি চাষ এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর প্রসার ঘটলে শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, বরং পুরো উত্তরাঞ্চলেই নতুন এই ফলের বাজার তৈরি হবে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত হবে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার।