সংবাদপত্রের সোনালী দিন টিকিয়ে রাখা রুহিয়ার এক অনন্য কারিগর

ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে সংবাদপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন হাসান আলী। বয়স প্রায় ৬৭ বছর। তবুও থেমে নেই তাঁর পথচলা। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বৈরী আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারে না। সামান্য আয়ের আশায় নয়, বরং মানুষের হাতে সময়মতো সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধ থেকেই প্রতিদিন ছুটে চলেন তিনি।
প্রতিদিন সকাল হলেই রুহিয়ার বাড়ি থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও জেলা শহরে যান হাসান আলী। সেখানকার পত্রিকার দোকান থেকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকা সংগ্রহ করেন। এরপর পত্রিকাগুলো সুন্দরভাবে গুছিয়ে সাইকেলের সঙ্গে বেঁধে শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের কর্মযাত্রা।রুহিয়া চৌরাস্তা, মধুপুর, ঢোলারহাট, উত্তরা বাজার, রামনাথ হাট, সেনিহারী বাজার, রাজাগাঁও, পাটিয়াডাঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাইকেল চালিয়ে সংবাদপত্র পৌঁছে দেন তিনি।বাজারের দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেন জাতীয় দৈনিকের পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকাও।দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কপি সংবাদপত্র পাঠকের হাতে তুলে দেন হাসান আলী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করে সাইকেল চালিয়ে পাড়ি দেন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ। কখনো তীব্র রোদ, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি—সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই চলে তাঁর সংবাদপত্র বিতরণের কাজ।
হাসান আলী বলেন, “প্রতিদিন সকালে ঠাকুরগাঁও শহর থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে রুহিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিই। রোদ-বৃষ্টি কিংবা খারাপ আবহাওয়া থাকলেও পত্রিকা বিতরণ বন্ধ করি না। প্রয়োজনে ছাতা নিয়ে বের হই। সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা পৌঁছে দিতে এখনো আমার তেমন কোনো সমস্যা হয় না। পত্রিকা বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালাই।”
স্থানীয় রামনাথ হাটের এক দোকানদার বলেন, “হাসান ভাই প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে আমার দোকানে সংবাদপত্র দিয়ে আসছেন। প্রতিদিন সাইকেলে করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকা নিয়ে আসেন। মাস শেষে পত্রিকার বিল পরিশোধ করি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুতেই তাঁর আসা বন্ধ হয় না। তাঁর এই পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়।”
রুহিয়ার স্থানীয় সাংবাদিকরাও হাসান আলীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, সংবাদপত্রের পাঠক তৈরি ও মানুষের কাছে প্রতিদিনের খবর পৌঁছে দিতে হাসান আলীর মতো পরিশ্রমী সংবাদপত্র বিক্রেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকেরা আলোচনায় এলেও পাঠকের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার পেছনে থাকা এসব পরিশ্রমী মানুষের কথা আড়ালেই থেকে যায়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অনলাইনে মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের খবর জানতে পারছেন। তবুও অনেক পাঠকের কাছে হাতে ধরে সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস এখনো অটুট। আর সেই অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে রুহিয়ার পথে পথে সাইকেল নিয়ে ছুটে চলেছেন হাসান আলী।প্রায় ২৫ বছরের এই কর্মজীবনে তাঁর সঙ্গী একটি সাইকেল, মাথার ওপর কখনো প্রখর রোদ, কখনো বৃষ্টির ছাতা আর সাইকেলের সঙ্গে বাঁধা একগুচ্ছ সংবাদপত্র। সংবাদপত্র বিক্রি করে সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলে তাঁর সংসার। কিন্তু প্রতিদিন মানুষের হাতে খবর পৌঁছে দেওয়ার যে নিরলস দায়িত্ব তিনি পালন করে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে এক অনন্য পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের গল্প।
রুহিয়ার মানুষের কাছে হাসান আলী শুধু একজন সংবাদপত্র বিক্রেতা নন; তিনি প্রতিদিনের খবর পৌঁছে দেওয়া এক পরিচিত মুখ। তাঁর সাইকেলের চাকার সঙ্গে ঘুরছে জীবিকার সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই প্রতিদিন মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের নানা খবর।