সড়কে শৃঙ্খলার সংকট, লালমনিরহাটে বাড়ছে দুর্ঘটনা-প্রাণহানি

লালমনিরহাটে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৫৮টি বড় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১২১ জন। বেপরোয়া গতি, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালক, অবৈধ যানবাহনের চলাচল এবং সড়কে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬২টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন, ২০২৪ সালে ৬৮টি দুর্ঘটনায় ৪২ জন এবং ২০২৫ সালে ৭৫টি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৫৮টি দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসের উপজেলা-ভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে পাটগ্রামে। এ সময়ে সেখানে ১৩টি দুর্ঘটনায় আটজন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন। কালীগঞ্জে ১১টি দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও ২৭ জন আহত হন। হাতীবান্ধায় ১০টি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আদিতমারী ও লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ছয়টি করে দুর্ঘটনা ঘটেছে। আদিতমারীতে তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। সদরে তিনজন নিহত ও ১৮ জন আহত হন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, লালমনিরহাট-বুড়িমারী ও রংপুর-কুড়িগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের জেলার অংশে দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি। মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার, বালুবাহী ট্রলি ও অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রাতের বেলায় দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের অতিরিক্ত গতিও প্রাণহানির অন্যতম কারণ।
সম্প্রতি কালীগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় পা হারানো মোটরসাইকেল আরোহী আজহারুল ইসলাম (৩৮) বলেন, সড়কে হেলমেটবিহীন চালক ও অনুমোদনহীন ভারী যানবাহন চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।
মাইক্রোবাসচালক হাফিজুর রহমান বলেন, “কী কমু ভাই, কষ্টের কথা। এই রাস্তা দিয়া গর্ভবতী নিলে রাস্তাতেই বাচ্চা হইব—এমন অবস্থা।”
উদ্ধারকাজে যুক্ত ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও বালুবাহী ট্রলির চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতে দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা নিয়েও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। লালমনিরহাট ১০০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) জানান, গুরুতর আহত অনেক রোগী মাথায় আঘাত ও অঙ্গহানি নিয়ে হাসপাতালে আসেন। জেলায় পর্যাপ্ত ট্রমা কেয়ার সুবিধা ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
সার্বিক বিষয়ে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের লাইসেন্স যাচাইয়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সড়কসংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই এবং অবৈধ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মহাসড়কের উন্নয়ন প্রয়োজন।
ডিএ/