বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

অভাব-প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা

Orbit_2026

নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালান বাবা। সেই পরিবারের মেয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার এখন জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। পাঁচ-ছয় বছরের সাধনা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতেছেন তিনি। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর মোংলায় থাকা মাকে ভিডিও কলে সুখবর দিতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি লিকা।

নারী এককের ফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উর্মি আক্তারকে ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে হারিয়ে শিরোপা জেতেন ২৪ বছর বয়সী এই শাটলার। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে খেলা লিকা পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

লিকার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। মোংলায় বেড়ে ওঠা লিকার বাবা পেশায় মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে চলে তাঁদের চার সদস্যের সংসার। এমন পরিস্থিতিতেও খেলাধুলার স্বপ্ন থেকে সরে যাননি তিনি। ২০১৯ সালে মোংলায় প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের অধীনে একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি কোর্টে তাঁর ব্যাডমিন্টন-যাত্রা শুরু হয়। সেখানে তিন থেকে চার বছর অনুশীলনের পর দিনাজপুরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে এলোরা শাটলিন অ্যাকাডেমি, কাওসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ ও কোচের সহযোগিতাও তাঁর এগিয়ে চলার পথ সহজ করে।

জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি জানিয়ে লিকা বলেন, পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে খেলছেন তিনি। শুরু থেকেই বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য ছিল তাঁর। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় তিনি আনন্দিত ও গর্বিত। এবারের প্রতিযোগিতায় ছেলেদের বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়েদের বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতিতে একের পর এক ম্যাচ জিতে শিরোপা অর্জনকে নিজের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন তিনি।

পড়াশোনা ও খেলাধুলা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন লিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে সমন্বয় করতে হয় তাঁকে। তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলায় এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে পরিবারের সমর্থন তাঁকে সব সময় সাহস জুগিয়েছে। নিজের সাফল্যের পেছনে প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের অবদানও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

যবিপ্রবির ক্রীড়াসুবিধা প্রসঙ্গে লিকা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলা ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও ভালো অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কাফি স্যারের পাশাপাশি আরও দক্ষ কোচের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ সামলানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।

নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লিকার পরামর্শ, সাফল্যের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, শৃঙ্খলা, কোচের নির্দেশনা মেনে চলা এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকা জরুরি। তাঁর মতে, সাফল্য অর্জনে সময়, ধৈর্য ও পরিশ্রমের বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে পরিচিতি ও সম্মান অর্জনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

লিকার সাফল্যে গর্বিত যবিপ্রবি প্রশাসনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. অভিনু কিবরিয়া বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয়। লিকার এই অর্জনে তাঁরা গর্বিত ও আনন্দিত এবং ভবিষ্যতেও তাঁর আরও সাফল্যের প্রত্যাশা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে তিনি বলেন, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় শিক্ষার্থীরা ভালো করছেন। শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ও কোচদের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠায় এ সাফল্য আসছে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও খেলাধুলায় আরও ভালো ফল অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

জাতীয় শিরোপা জয়ের পর লিকার লক্ষ্য এখন সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। মোংলার একটি পুরোনো কোর্টে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা আজ জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুটে পৌঁছেছে। নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার মেয়ের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের পারিবারিক সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়েরও স্বীকৃতি। এবার আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টনের মঞ্চে দেশের পতাকা উঁচু করে ধরার স্বপ্ন দেখছেন লিকা।