নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনায় মুখর ঢাবির আরবি বিভাগ

একদিকে স্বপ্নের ক্যাম্পাসে প্রথমবার পা রাখা তরুণ তরুণীদের চোখেমুখে নতুনকে জানার ব্যাকুলতা, অন্যদিকে শিক্ষাজীবন শেষে প্রিয় বিদ্যাপীঠ ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে প্রবীণ শিক্ষার্থীদের মনে স্মৃতিমেদুর বেদনা। এই দুই অনুভূতির মাঝখানে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল মেধার স্বীকৃতি পাওয়া একঝাঁক কৃতী শিক্ষার্থীর গর্বিত হাসি। আনন্দ, আবেগ, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার এমনই এক সম্মিলন ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা ও মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে।
গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নবীনদের আগমন, প্রবীণদের বিদায় এবং মেধাবীদের সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আবহ। আয়োজনে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের মাত্রা যোগ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি।
আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নূরে আলমের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ বি এম সিদ্দিকুর রহমান নিজামী। তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাগত জানিয়ে আরবি ভাষার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান। পরে নবীনদের হাতে নামাঙ্কিত ক্রেস্ট ও পবিত্র কোরআন শরিফ তুলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নবীন ও বিদায়ী শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশ। নবীনদের মধ্য থেকে প্রথম বক্তা সাবলীল আরবি ভাষায় নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। তিনি বলেন, “نحن سعداء جداً بالانضمام إلى هذا القسم العريق بجامعة دكا، وسنبذل قصارى جهدنا لتحقيق أحلامنا وإحياء تراث اللغة العربية।”
এর অর্থ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্যবাহী বিভাগে যুক্ত হতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত। নিজেদের স্বপ্ন পূরণ এবং আরবি ভাষার ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
নবীনদের আরেক প্রতিনিধি ইংরেজিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, “Entering Dhaka University is a dream come true for us. Learning Arabic will not only connect us to a rich heritage but also open global opportunities in literature and international relations.”
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, আরবি ভাষা শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
অন্যদিকে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি চার বছরের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “Leaving this department feels like leaving a part of our souls behind.” সংক্ষিপ্ত এই বাক্যেই যেন ধরা পড়ে প্রিয় বিভাগ ছেড়ে যাওয়ার বেদনা, সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো সময় এবং শিক্ষাজীবনের অমূল্য স্মৃতির প্রতি গভীর টান।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি তাঁর বক্তব্যে আরবি ভাষার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আরবি ভাষা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিশ্ব অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের মধ্যে কূটনৈতিক সৌহার্দ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস চ্যান্সেলর প্রশাসন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি প্রদান। বিভাগের তিনটি প্রধান বৃত্তি তহবিল থেকে মোট ৪০ জন শিক্ষার্থীকে মেধাবৃত্তি ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হয়। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল অর্জনে অনুপ্রেরণা জোগাবে। এ ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি ও আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতকে আরবি বিভাগের পক্ষ থেকে স্মারক উপহার হিসেবে দৃষ্টিনন্দন আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রদান করা হয়।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য কেবল শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও স্বপ্নের যে সেতুবন্ধ গড়ে ওঠে, তার মধ্যেই নিহিত থাকে শিক্ষাঙ্গনের প্রকৃত প্রাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের এই আয়োজনেও নবীনদের সম্ভাবনা, প্রবীণদের স্মৃতিকাতরতা এবং মেধাবীদের স্বীকৃতি মিলেমিশে সেই সেতুবন্ধেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। আনন্দ, বিদায় ও অর্জনের এই সম্মিলন বিভাগের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।