বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

ভাওয়ালগড়ে সেন্ট্রালিয়ানদের আনন্দমুখর এক দিন

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

মেরাজুল ইসলাম:

ঢাকার এত কাছে এত বিশাল একটি বন থাকতে পারে, তা ভাবতেই অন্যরকম রোমাঞ্চ কাজ করছিল। এই রোমাঞ্চকর অনুভূতির সাক্ষী হতেই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রায় ৩০০ জন সেন্ট্রালিয়ান মিলে আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল ভাওয়ালগড়। শনিবার সকাল ৯টায় কলেজ গেট থেকে বাস ছাড়ার পর থেকেই শুরু হয় গান, গল্প আর জমজমাট আড্ডা। আনন্দের জোয়ারে পুরো রাস্তা কীভাবে কেটে গেল তা টেরই পেলাম না। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম প্রকৃতির এক স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে।

ভেতরে প্রবেশ করতেই বাঁ দিকে চোখে পড়ল একটি সুন্দর মসজিদ। মসজিদের উঠান জুড়ে থাকা হরেক রকম ফুলের সুবাস যেন রাস্তা থেকেই অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। আরেকটু এগোতেই একটি চমৎকার মাঠ, চারপাশে সবুজের সমারোহ, একটি দোকান ও একটি শান্ত পুকুর। সেখানে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঘোষণা দেওয়া হলো, দুপুর ১টার মধ্যে সবাইকে এই মাঠে উপস্থিত থাকতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে কেউ যেন একা বনের গভীরে না যায় এবং সবাই যেন ছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেই নির্দেশও দেওয়া হলো।

নির্দেশনা মেনে আমরা আমাদের বিভাগের ১৬ জন মিলে একটি দল গঠন করে বনের সরু পথ ধরে ভেতরের দিকে এগোতে থাকি। ‘বকুল ফুল বকুল ফুল’ কিংবা ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ এর মতো কালজয়ী বাংলা গানগুলো গাইতে গাইতে আমরা বনের গভীরে প্রবেশ করছিলাম। যত ভেতরে যাচ্ছিলাম, চারপাশের গাছপালা তত বিশাল ও জঙ্গল ঘন হচ্ছিল।

এই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান মূলত গাজীপুর জেলা সদর ও শ্রীপুর উপজেলায় অবস্থিত, যার আয়তন প্রায় ৫,০২২ হেক্টর। ১৯৭৪ সালের আইন অনুসারে ১৯৮২ সালে এটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়। হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছিল লোকমুখে প্রচলিত ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’র গল্প আর ভাওয়াল রাজবংশের কথা, যার ইতিহাস এই গড়ের প্রতিটি ধুলিকণার সাথে মিশে আছে। একসময় নাকি এখানে বাঘ, চিতা ও ময়ূরের বিচরণ ছিল। এখন সেসব না থাকলেও বনের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসছিল বানর, হনুমান আর নানা জাতের সরীসৃপ ও পাখির ডাক। খানিক দূর পর পর দেখা মিলছিল ছোট ছোট পরিত্যক্ত ঘরের, যা বনের পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল।

বনের ভেতরে থাকা বিশাল ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশের মনোরম পরিবেশ উপভোগ করাটা ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা। টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে মজাদার আমভর্তা খেয়ে আবার মূল মাঠে ফিরে এলাম। ততক্ষণে দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করে পুকুরপাড়ে বসে অনেকেই তৃপ্তি করে পোলাও, রোস্ট আর মোজো দিয়ে আহার সারছিল। ঠিক তখনই ঘটল এক মজার কাণ্ড। হঠাৎ গাছ থেকে একটি বানর নেমে এসে এক ছাত্রীর হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে চোখের পলকে আবার গাছে উঠে গেল। একেবারে চোখের সামনে ঘটা এই দৃশ্যটি অনেক দিন মনে থাকবে।

খাওয়া দাওয়া শেষে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই সবাই মেতে উঠল ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত নানা খেলায়। ‘জুতো চুরি’ সহ বিভিন্ন মজার খেলার পর শুরু হলো ঝুড়িতে বল নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা। চারজন বিজয়ী হলেও আমার ছোঁড়া বলটি ঝুড়িতে না পড়ে বাইরে চলে যাওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ থেকে গেল। তবে সেই আক্ষেপ ঘুচল পরের ইভেন্ট ‘হাঁড়ি ভাঙা’ প্রতিযোগিতায়। এতে ছেলেদের মধ্য থেকে আমি এবং মেয়েদের মধ্য থেকে একজন বিজয়ী হলাম। পুরস্কার হিসেবে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো সুন্দর ফুল।

সবশেষে আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে ফ্রেমবন্দি করতে বেশ কিছু গ্রুপ ছবি ও ভিডিও করা হলো। বিকেল ৫টায় একরাশ সুন্দর স্মৃতি নিয়ে আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিই এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পৌঁছাই। দিনটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি দিন হয়ে থাকবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি