ইবি শিক্ষার্থীদের স্মৃতিকথায় প্রিয় শিক্ষকেরা

শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি আমাদের পরিবারের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আত্ম-উন্নয়নমূলক ও জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে একজন আদর্শ শিক্ষক আমাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রতিবছর ৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি আমাদের সামনে শিক্ষার অগ্রগতিতে শিক্ষকদের অপরিসীম ভূমিকা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ, একটা সময় পর আমরা অনেকেই শিক্ষকদের অবদান ভুলে যাই। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে নিজেদের প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিকথা জানাচ্ছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান।
আমার জীবনের খেরোখাতায় কেবল প্রিয় শিক্ষকদেরই নাম লেখা। পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তো কখনো অপ্রিয় হতে পারেন না, তাঁরা কেবলই হৃদয়ে ভক্তি আর ভালোবাসায় আগলে রাখার মতো মানুষ। আমার প্রিয় শিক্ষকদের দীর্ঘ তালিকায় অনেকের নামই অম্লান হয়ে আছে, তবে যাঁর নাম উচ্চারণ না করলে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অপূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন শ্রদ্ধেয় সীতেশ চন্দ্র সিংহ রায়। তিনি ছিলেন জয়পুরহাট জেলার সরকারি সাঈদ আলতাফুন্নেছা কলেজের রসায়ন বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক। দশম শ্রেণিতে রসায়নের জটিল সূত্রগুলো সহজ পাঠে শেখার মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
তাঁর প্রাঞ্জল পড়ানোর পদ্ধতি, ক্লান্তিহীন শেখানোর ইচ্ছা আর শিক্ষার্থীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি নামমাত্র সম্মানীর বিনিময়ে আমাদের পড়াতেন। শিক্ষাকে তিনি কখনো বাণিজ্যের দাঁড়িপাল্লায় মাপেননি। দেখেছি, সারা বছর পড়ার পর কিছু শিক্ষার্থী অভাবের কারণে নামমাত্র ফি দিচ্ছে, অথচ স্যারের আন্তরিকতায় বিন্দুমাত্র কমতি ঘটেনি। তাঁর নিঃস্বার্থ রূপটি আমাকে বারবার অভিভূত করেছে। ক্লাসে তিনি এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বাসায় গিয়ে কখনো আলাদা করে পড়া মুখস্থ করতে হতো না। সর্বোপরি, স্যার এতটাই অমায়িক ও বন্ধুসুলভ ছিলেন যে যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে আমাদের মনে কখনো কোনো ভয় কাজ করেনি। একজন মহান শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, বরং শিক্ষার্থীর মনে জানার আগ্রহ এবং বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে দেন। সীতেশ স্যার হলেন সেই আলোর দিশারি, যিনি আমার হৃদয়ে আজীবন পূজনীয় হয়ে থাকবেন।
— মো. আব্দুল্লাহ আল নোমান, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
জীবন গঠনের কারিগররা
জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, আজকের আমি আসলে কোনো একজন মানুষের পরিচর্যার ফল নই। আমার ‘আমি’ হয়ে ওঠার গল্পে অনেক মানুষের ছায়া আছে। কারও স্নেহ, কারও শাসন, কারও একটি ছোট্ট কথা, কিংবা কখনো শুধু নীরবে পাশে থাকার মধ্য দিয়েই আমি একটু একটু করে বড় হয়েছি। কেউ আমাকে কবিতা ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, কেউ শিখিয়েছেন মানুষের অনুভূতি বুঝতে। আবার কেউ শিখিয়েছেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, নিজের সত্য আর মূল্যবোধ থেকে যেন কখনো সরে না যাই।
আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক অবশ্যই আমার মা-বাবা। বড় ভাইসহ জীবনের বিভিন্ন সময়ে যাঁরা আমাকে পথ দেখিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আমার শিক্ষক। কেউ হয়তো কয়েকটি কথা বলেছেন, কিন্তু সেই কথাগুলোই কোনো একসময় আমার জন্য বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কারও জীবনযাপনই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে নীরব, অথচ গভীর পাঠ। তাই একজন মানুষকে আলাদা করে ‘প্রিয় শিক্ষক’ বললে হয়তো আমার স্মৃতির অনেক প্রিয় মুখের প্রতি অন্যায় করা হবে। কারণ আজকের আমার ভেতরে তাঁদের প্রত্যেকেরই একটু একটু করে অস্তিত্ব আছে। হয়তো সবাইকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর সুযোগ কোনো দিন হবে না। তাই আমার কাছে কৃতজ্ঞতা শুধু একটি শব্দ নয়, বরং একটি দায়িত্ব। আমি যখন ভালো কিছু করার চেষ্টা করি বা মানবিক হই, তখন মনে হয়, তাঁদের দেওয়া শিক্ষাগুলোই আমার ভেতর দিয়ে বেঁচে আছে।
— শেখ তাসনিম ফাতিমা, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ।
স্মৃতিতে অমলিন প্রিয় শিক্ষক
“সাধারণ মানের শিক্ষক বলেন, ভালো শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক প্রদর্শন করেন আর মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন।” – উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড। একজন শিক্ষককে আমরা সাধারণত শ্রেণিকক্ষের মানুষ হিসেবেই জানি। কিন্তু তাঁর সঠিক উপলব্ধি হয় শিক্ষাজীবন শেষে, জীবন চলার পথে। আমার প্রিয় শিক্ষক এমনই একজন, যাঁর ক্লাসের সব কথা হয়তো আজ মনে নেই, কিন্তু তাঁর পড়ানোর ধরন, ভুল করলে বুঝিয়ে দেওয়া ও পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দিকে একটু বেশি নজর দেওয়া—এসব কথা এখনো আমার স্মৃতিপটে ভাস্বর।
তিনি সবার সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন, অযথা কঠোর হতেন না, তবে শৃঙ্খলার ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। পড়ালেখার পাশাপাশি চরিত্র ও আচরণের প্রতিও তিনি সমান গুরুত্ব দিতেন। সময়ের সঙ্গে ক্লাস, সহপাঠী এবং নিত্যদিনের ব্যস্ততায় প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলো অনেক ফিকে হয়ে এসেছে। কিন্তু তাঁর কিছু সহজ-সাবলীল কথা এখনো জীবনের প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে। সর্বোপরি বলতে পারি, একজন শিক্ষকের আসল সাফল্য হয়তো তিনি যা পড়িয়েছেন তা কতটা মনে আছে তাতে নয়, বরং শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছ থেকে কতটা ভালো মানুষ হতে শিখেছে, তাতেই নিহিত। অন্তত এই একটা জায়গাতেই আমার প্রিয় শিক্ষক আমার কাছে আজও বিশেষ।
— এম. তাওকীর আহমদ, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ।
জীবনের দর্পণে প্রিয় শিক্ষক
শিক্ষাজীবনের অঙ্গনে অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে আমার শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তবে তাঁদের ভিড়ে চামাগ্রাম হে. না. উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ মনোয়ার কালু স্যার আমার কাছে একটু বেশি প্রিয়। তিনি আমাদের শারীরিক শিক্ষা ক্লাস নিতেন। তিনি ক্লাসে এলেই পরিবেশটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। ক্লাসে আসামাত্রই আমার নাম ধরে মজা করে গেয়ে উঠতেন, ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’। আজও সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লে মনটা অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে যায়।
তবে স্যারের ভালোবাসার সঙ্গে শাসনও ছিল। অন্যায় বা ভুল কিছু দেখলে তিনি কখনো ছাড় দিতেন না। একবার খুব ছোট একটি কারণে তিনি আমার ওপর রাগ করেছিলেন। অভিমান এতটাই ছিল যে অনেক দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি। তখন তাঁর নীরবতাও আমার কাছে শাসনের চেয়ে বেশি কষ্টের ছিল। কারণ বুঝেছিলাম, তাঁর রাগের আড়ালেও ছিল আমার জন্য ভালো চাওয়ার গভীরতা। আমার যেকোনো প্রয়োজনে তিনি পাশে থেকেছেন, সাহস দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন। তাই আজ মনে হয়, আদর্শ শিক্ষক শুধু ভালোবাসতেই জানেন না, প্রয়োজনে শাসন করতেও জানেন। মনোয়ার কালু স্যার আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি আমার শিক্ষাজীবনের এক টুকরো আলো, এক গভীর মায়া।
— ফাইজা আক্তার আলো, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ।
আলোর পথপ্রদর্শক
বিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো প্রতিটি মানুষের জীবনেই বিশেষ। তবে আমার মাধ্যমিক জীবনের অধ্যায়ে দাশেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান স্যারের অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আমাদের শিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং জীবনের সঠিক পথ বেছে নিতে শিখিয়েছেন। যখনই পড়ালেখা কিংবা জীবনের কোনো মোড়ে থমকে দাঁড়িয়েছি, মিজান স্যার পরম মমতায় সঠিক পথ দেখিয়েছেন। আমার জীবনের সঠিক ‘ইউ-টার্ন’ নিতে শেখানো মানুষটিই হলেন তিনি।
যখন নিজের লক্ষ্য ও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিলাম, তখন স্যারের দেওয়া দিকনির্দেশনা ও অকৃত্রিম উৎসাহ আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন—ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। স্যারের সেই অনুপ্রেরণাদায়ী কথাগুলোই আজ আমার চলার পথের সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্লাসরুমের গণ্ডি পেরিয়ে মিজান স্যার আমাদের শিখিয়েছেন নীতি, আদর্শ ও ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র। আজ জীবনের প্রতিটি অর্জনে এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে স্যারের সেই স্মিত হাসিমাখা দিকনির্দেশনার কথা মনে পড়ে। তিনি কেবল একজন আদর্শ শিক্ষক নন, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া চিরন্তন দিশারি।
— আসফিয়া কানিজ ফাতেমা, শিক্ষার্থী, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ।
শুভ্র/