স্বজনদের প্রতি টান আর ক্যাম্পাসই এখন নতুন স্থান

হাবীব আদনান:
দিনটি ছিল ৫ জুন শুক্রবার। গোসল শেষ করে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই ফোনে একটি নোটিফিকেশন এল। ফোনটা হাতে নিতেই গা শিউরে উঠল। গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইট চেক করলাম। দেখলাম গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাই মায়ের কাছে। খবরটি শুনে মা আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। আব্বা তখন মসজিদে ছিলেন। আমিও দ্রুত মসজিদে চলে গেলাম। মসজিদের ভেতরেই আনন্দের সংবাদটা আব্বাকে দিলাম। পাশেই ছিলেন বড় চাচা, তাঁকেও খবরটি জানালাম। এরপর নামাজ শেষ করে ভাই বোন, চাচা চাচি ও খালা খালুসহ সবাইকে জানালাম। বন্ধু বান্ধবেরাও ফলাফলের খোঁজ নিল।
কিছুদিন পর নোটিশ এল, ১৫ জুলাই থেকে ক্লাস শুরু। একদিকে যেমন চান্স পাওয়ার খুশি, অন্যদিকে ঠিক তেমনই বাড়ি ছাড়ার বেদনা ভর করল মনে। স্বজনদের ছেড়ে এত দূরে একা থাকতে হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তবুও কিছুই করার থাকে না, কারণ বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আমার বাড়ি রাজশাহী জেলায়। সেখান থেকে গোপালগঞ্জ বেশ দূরের পথ, প্রায় আট ঘণ্টার রাস্তা। তবে যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হলো ট্রেন টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, যা দুপুর সাড়ে তিনটায় গোপালগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দেখতে দেখতে চলে এল কাঙ্ক্ষিত সেই সময়, ১৪ জুলাই। বইপত্র ও পোশাকসহ যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নতুন গন্তব্যে রওনা দিলাম। বাড়ি ছাড়ার মুহূর্তটা আসলে ভাষায় বুঝিয়ে বলার মতো নয়। মায়ের অশ্রুঝরা চোখ দেখে আমিও নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়। রাত ১১টা নাগাদ গোপালগঞ্জ পৌঁছাই। পরদিন সকালে আমাদের সিনিয়র ভাই আপুরা ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করেন। তাঁরা আমাদের সবাইকে সমাজবিজ্ঞান পরিবারে বরণ করে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম দিনটি সত্যিই অনেক আবেগঘন ছিল, যা আজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে ক্লাস শুরু হয়। নিয়মিত ক্লাস করায় সহপাঠীদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। এছাড়া সিনিয়রদের আন্তরিকতায় আমাদের চলার পথটা আরও সহজ হয়ে ওঠে। এখানকার শিক্ষক শিক্ষিকারাও বাবা মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। একেবারে নিজেদের সন্তানের মতো স্নেহ করেন। ফলে বাড়ির প্রতি যে শূন্যতা, সেটি তাঁরা অনেকটাই কমিয়ে দেন। ক্যাম্পাসের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে আবেগের অংশ হয়ে যায়। এই ক্যাম্পাসের প্রতি আলাদা এক মায়া কাজ করে এখন। অপরিচিত জায়গাটি এত তাড়াতাড়ি এত আপন হয়ে যাবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। ৫৫ একরের এই ছোট্ট ক্যাম্পাসকে সত্যিই অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ (১ম বর্ষ)
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়