শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা ও ক্যাম্পাসের বন্ধন

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

শৈশবের চেনা আঙিনা আর মায়ের হাতের ছোঁয়া পেছনে ফেলে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী পা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে। ঘর ছাড়ার প্রথম দিকের একাকীত্ব ও হাহাকার পেরিয়ে সময়ের পরিক্রমায় সেই অচেনা ক্যাম্পাসই ধীরে ধীরে রূপ নিতে শুরু করে আরেক নীড়ে। একদিকে শেকড় ও পরিবারের টানে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের ছোট ছোট মায়াজালে তৈরি হওয়া ভালোবাসার এই দ্বান্দ্বিক অনুভূতি ও নবীনদের পথচলার গল্পগুলো তুলে ধরেছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তায়ীম খান।

ঘর ছাড়ার পর যে ঘর খুঁজে পেলাম
হালিমা আক্তার
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ

বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার আগে বুকের ভেতর ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা ও নতুন স্বপ্নের ঢেউ। নতুন শহর, নতুন মুখ, নতুন স্বাধীনতা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল জীবনটা বুঝি আরও রঙিন হয়ে উঠবে। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই টের পেলাম, আমি আসলে বড্ড ঘরকুনো। কারণ ছাড়াই মায়ের মুখ ভেসে উঠত, মন পড়ে থাকত বাড়ির উঠोনে।

এখানে এসে প্রথমবার বুঝেছি, মা আসলে একজন অলরাউন্ডার। কীভাবে, কেমন করে যেন তিনি ঘরের সবকিছু সামলে নিতেন! অথচ এখানে এসে আমি একাই নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। মাকে ফোনে রেখে নতুন নতুন রান্না শিখেছি। কখনো নিজের হাতের সেই বেখাপ্পা রান্না মুখে তুলতেই চোখ ভিজে উঠেছে। খাবারের স্বাদ খারাপ বলে নয়, মায়ের হাতের সেই চেনা স্বাদটা না পাওয়ার আক্ষেপে। এখনো অপেক্ষায় থাকি কখন বাড়ি যাব, আর কখন মায়ের রান্না খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলব!

বাবার কথাও মনে পড়ে খুব। বাবা বাড়ি ফেরার সময় আমার জন্য কিছু না কিছু মজার জিনিস নিয়ে আসতেন। বাড়ির প্রধান ফটকে এসেই আমাকে খেপানোর জন্য উঁচু গলায় আওয়াজ তুলতেন, “আমি কিন্তু আজ কারও জন্য কোনো মজা নিয়ে আসিনি!” তবে আমি কখনোই খেপতাম না; বরং দৌড়ে গিয়ে আমার প্রাপ্য বুঝে নিতাম। এখন হয়তো আপনারা ভাবছেন, কেন খেপতাম না? কারণ আমার বোকা বাবা বছরের ৩৬৫ দিন মজা নিয়ে এসেও একই কথা বলেন! একেবারে সেই ‘বাঘ আর রাখাল’-এর গল্পের মতো।

এখন অগোছালো ঘরটার দরজা খুলতেই সেই চেনা দৃশ্যটা আর চোখে পড়ে না। প্রথম দিকে ভিডিও কলে কথা বলার চেয়ে কান্নাই বেশি করতাম। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুকের সেই ব্যথা কিছুটা সয়ে এসেছে। এই সয়ে যাওয়ার পেছনে আমার ব্যাচমেটদের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রেখেছে আমার বিভাগ। আমাদের বিভাগের দশ বছর পূর্তিতে পেয়েছি এক জমকালো আয়োজন ‘Echoes of a Decade’। সেই আয়োজনের হাত ধরেই সিনিয়র ও শিক্ষকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আপনজনের মতো এক আন্তরিক বন্ধন, যা নতুন পরিবেশে টিকে থাকাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। সত্যিই, এই আপন করে নেওয়ার জন্য সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

এরপর যুক্ত হয়েছি নতুন নতুন ক্লাবে। ‘Come For Road Child (CRC)’-তে ছুটির দিনে পথশিশুদের পড়াতে গিয়ে যে প্রশান্তি পাই, তা প্রতিদিন ক্যাম্পাসে ফেরার টান বাড়িয়ে দেয়। বিতর্ক আমার অত্যন্ত প্রিয়, আর ‘তরুণ লেখক ফোরাম’ হয়ে উঠেছে মনের কথা বলার নিজস্ব এক আশ্রয়। আরও কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে এই ক্যাম্পাসেই নিজের একটি জগৎ তৈরি করেছি।

মানুষ নাকি অভ্যাসের দাস। আমিও এখন সেই দাসত্বে বেশ সুখী। আজও বাড়ি ফেরার জন্য মন ব্যাকুল হয়, কিন্তু একই সঙ্গে এই ক্যাম্পাসের মানুষ, স্মৃতি আর মায়াগুলো ছেড়ে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারি না। যে জায়গাটি একদিন ছিল অচেনা, সেটিই আজ আমার আরেকটি ঘর। হয়তো এটাই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দ্বন্দ্ব: একদিকে বাড়ি ফেরার আকুলতা, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে থেকে যাওয়ার মায়া।

আঙিনার ডাক: ফিরে যাওয়ার নীরব আকুতি
প্রদীপ স্বর্ণকার
অর্থনীতি বিভাগ

বৃহস্পতিবার এলেই মনটা কেমন উসখুস করে ওঠে, যেন অদৃশ্য কোনো সুতোয় টান পড়ে। সপ্তাহের পাঁচটা দিন ক্যাম্পাস, ক্লাস আর নতুন মানুষের কোলাহলে কেটে গেলেও বৃহস্পতিবারের বিকেলটা যেন একটু আলাদা। কারও চোখে বাড়ি ফেরার তিতিক্ষা, কারও বুকে না-ফেলতে-পারার চাপা দীর্ঘশ্বাস। তবু সবার মনের কোথাও একটা ছোট্ট ইচ্ছা ঠিক লুকিয়ে থাকে, ফিরে যাই নিজের আঙিনায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখার সময় কখনো ভাবিনি, একদিন পরিবার থেকে এত দূরে থাকতে হবে। ভাবিনি, প্রতিদিনের চিরচেনা অভ্যাসগুলো ছেড়ে নতুন একটা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। চেনা মুখগুলো না দেখে কেটে যাবে দিনের পর দিন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর ভেবেছিলাম, নতুন মানুষ, নতুন জায়গা ও নতুন পরিবেশ সবকিছুর সঙ্গে খুব সহজেই মানিয়ে নেব। বাড়ির চেনা রান্নার স্বাদটাও তখন নতুন করে টের পেতে শুরু করলাম। মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের মানুষদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া ও পরিচিত ঘরের পরিবেশ—এসবের দাম যে কতখানি, দূরে না এলে হয়তো কোনোদিন বুঝতামই না।

ভর্তির প্রক্রিয়া চুকে যেতেই শুরু হলো নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অদ্ভুত অভিযান। নিজের বিভাগের সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, অন্য বিভাগের মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হচ্ছে। প্রতিদিনই যেন নতুন কোনো মুখ পরিচিত হয়ে উঠল। তবু এত মানুষের ভিড়েও অনেক মুখ এখনো অচেনা। তাই একটু একটু করে এগোচ্ছি, অচেনা মানুষগুলোকে আপন করছি এবং সেই সঙ্গে এই অচেনা ক্যাম্পাসটাকেও ধীরে ধীরে নিজের করে নিচ্ছি।

সারাদিন উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় পাখিরা যেমন নীড়ে ফেরে, সপ্তাহ শেষে আমাদের মনও তেমনি ফিরে যেতে চায় সেই ছোট্ট ঘরটিতে। যেখান থেকে আমাদের শুরু, যেখানে আমাদের বেড়ে ওঠা—সেই বাড়ি, সেই মানুষগুলো আর সেই চেনা উঠান আজও আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু আশ্চর্য, প্রায় দুই মাসের ক্যাম্পাসজীবন সেই অনুভূতিটাকেও একটু একটু করে বদলে দিচ্ছে। বাড়িতে গিয়েও এখন কখনো মনে হয়, কী যেন একটা নেই। মনে পড়ে যায় ক্যাম্পাসের বন্ধুদের কথা, আড্ডার কথা, ক্লাসের কথা এবং হঠাৎ তৈরি হওয়া ছোট ছোট স্মৃতিগুলোর কথা।

যে ক্যাম্পাস একদিন ছিল পুরোপুরি অচেনা, সেটাই আজ আমার নিজেরই একটা অংশ হয়ে উঠল। হয়তো এটাই নতুন জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। প্রথমে নতুন জায়গাটা অচেনা থাকে, মানুষগুলো অচেনা থাকে। তারপর কিছু মানুষ বন্ধু হয়ে ওঠে, কিছু জায়গা স্মৃতির অংশ হয়ে যায় এবং অচেনা পরিবেশটাও একসময় আপন হয়ে যায়। কারণ পৃথিবীর যত জায়গাই আপন হোক, নিজের বাড়ি, নিজের মানুষ আর শেকড়ের কাছে ফেরার ইচ্ছাটা মনের কোনো এক কোণে নীরবে থেকে থাকে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই হয়তো গড়ে ওঠে আমাদের নতুন জীবন, যেখানে পুরোনো আঙিনার মায়া আর নতুন আঙিনার ভালোবাসা পাশাপাশি ঠাঁই পায়।

ক্যাম্পাস: মায়ার আরেক ঠিকানা
তিষা বাগচী
অর্থনীতি বিভাগ

বাড়ি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার প্রথম দিনটি আজও স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। চেনা উঠোন, মায়ের মধুমাখা কণ্ঠ, আঁচলের ঘ্রাণ আর আপনজনদের ছায়া পেছনে ফেলে বুকভরা নীরব শূন্যতা নিয়ে অজানার পথে রওনা হয়েছিলাম। সেটা ছিল কেবল স্থান বদল নয়; শৈশবের নিরাপদ ছায়া থেকে এক অনিশ্চিত অথচ সম্ভাবনাময় অধ্যায়ে প্রবেশ।

নতুন শহর ও নতুন ক্যাম্পাসে প্রথম কয়েকটা দিন কেটেছে সংকোচ আর দ্বিধার কুয়াশায়। চারপাশে মানুষের কোলাহল, ডাইনিংয়ের একঘেয়ে খাবারের গন্ধ এবং রাতে অচেনা রুমমেটের নিঃশ্বাস সবকিছু বারবার মনে করিয়ে দিত মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ, সন্ধ্যার পারিবারিক আড্ডা আর মায়ের বকুনিমাখা আদর। একদিন করিডরের পর করিডর পেরোতে পেরোতে অগণিত মানুষের ভিড়েও নিজেকে মনে হতো নির্বাসিত এক নিঃসঙ্গ দ্বীপবাসী।

অথচ সময়ের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সেই অচেনা শহর আর ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ আজ বদলে গেছে। পাশের বেঞ্চের সহপাঠীর সরল হাসি, করিডরে হঠাৎ জমে ওঠা গল্প, ক্লাস শেষের ক্ষণিকের আড্ডা কিংবা সিনিয়রের ধমকে মেশানো আদুরে পরামর্শ—এই তুচ্ছ মুহূর্তগুলোই এখন হয়ে উঠেছে অমূল্য। যে সহপাঠী কাল ছিল অচেনা, আজ তার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া যায়; চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুদের উষ্ণ আড্ডায় কেটে যায় গোটা একটা বিকেল।

ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমার আসলে দুটি ঠিকানা: একটি জন্মসূত্রে পাওয়া, অন্যটি নিজের হাতে গড়া। ট্রেন বা বাসের জানালায় বসে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা যতটা তীব্র, ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার টানও আজ ঠিক ততটাই।

যত দূরেই যাই, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে
মেহেদী হাসান
লোক প্রশাসন বিভাগ

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে আন্দাজ করেছিলাম দূরে থাকা একটু কঠিন হবে, কিন্তু কখনো ভাবিনি বাড়ি থেকে দূরে থাকা এতটা কঠিন হতে পারে। আমার পরিবার বলতে আমি আর আমার আম্মু—আমরা দুজন। ঢাকায় আম্মু একা থাকেন, আর আমি পড়াশোনার জন্য এখন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রায় দুই মাস হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। সময়টা খুব বেশি নয়, অথচ এই অল্প সময়েই বাড়ির প্রতি টানটা যেন আরও গভীর হয়েছে। প্রতিটা দিন মন কাঁদে আম্মুর জন্য।

নতুন ক্যাম্পাস, নতুন মানুষ, নতুন জীবন—শুরুতে সবকিছুই ছিল অচেনা। পরিচিত মুখগুলোকে ছেড়ে এসে অপরিচিত মানুষদের ভিড়ে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। এখনো ঠিকভাবে মানিয়ে নিতেও পারিনি পুরোপুরি। ক্লাসের মাঝে মাঝে বা রাতে ঘুমানোর আগে আম্মু ফোন দিলে বাড়ি ফেরার টানটা আবার কাজ করে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আম্মুর কথা। ভাবি, আমি এখানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি, বন্ধুদের সঙ্গে হাসছি; অথচ ওই সময়ে আম্মু কত কষ্ট করে সব সামলাচ্ছেন।

তবে সময়ের সঙ্গে গোপালগঞ্জেও কিছুটা নিজের মতো করে মানিয়ে নিচ্ছি। কয়েকজন ভালো বন্ধু হয়েছে। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিই, ঘুরি, গল্প করি, কখনো অকারণেই হাসাহাসিতে সময় কাটে। তারপরও বাড়ি ফেরার আকুলতাটা থেকে যায়। বিশেষ করে আম্মুর কথা মনে পড়লেই মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। তিনি একা—এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। তাই প্রায় ১৪-১৫ দিন পরপরই ঢাকায় ছুটে যাই। ঢাকা গিয়ে দুটা দিন কাটালেও মনের শান্তি ফুরায় না।

বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন বন্ধু দিয়েছে, নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে এবং নিজের একটা জগৎ তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু আমার বাসা ও আমার মায়ের জায়গাটা আলাদা। এখন বুঝি বাসা থাকার কত মজা। গোপালগঞ্জে আমি আমার ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য এসেছি, কিন্তু আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সব তো আম্মু। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাকে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখাবে। কিন্তু যতই বড় হই, যত দূরেই যাই, ঢাকার সেই ছোট্ট ঘরে একা থাকা আম্মুর কথা মনে পড়লে আমার ভেতরের সেই ছেলেটা আজও বাড়ি ফিরতে চায়।

বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা, ক্যাম্পাসের বন্ধন
মোছা. মুমতাহিনা মোস্তাফিজ মাহি
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবর শুনে সবাই যখন আনন্দে মেতে উঠল, আমার ভেতরে তখন আনন্দের পাশাপাশি এক অদ্ভুত ভয় বাসা বাঁধছিল। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন জীবন—সবকিছুই ছিল স্বপ্নের মতো সুন্দর, আবার ঠিক ততটাই অচেনা। বাড়ি ছাড়ার দিন বাবা-মায়ের মুখটা বারবার চোখে ভাসছিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা শুধু বলেছিল, “নিজের যত্ন নিস।” কথাটা খুব সাধারণ, তবু সেদিন কেন যেন বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, চেনা পৃথিবীটাকেই বুঝি পেছনে ফেলে যাচ্ছি।

নতুন জীবনের প্রথম সকালটা আজও মনে আছে। ঘুম ভাঙতেই মনে হয়েছিল, আমি কি সত্যিই বাড়ি থেকে এত দূরে? জানালার বাইরে অচেনা রাস্তা, অচেনা মুখ, অথচ মনের ভেতর জুড়ে শুধু চেনা সেই বাড়িটা। ক্যাম্পাসে পা রাখতেই অবশ্য বুকের ভেতর একটুখানি আনন্দ আর উত্তেজনাও উঁকি দিয়েছিল। প্রথম কয়েকদিন ক্লাসে বসে চারপাশের মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতাম, কিন্তু কারও সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারতাম না। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যেন একরকম যুদ্ধ।

দিনশেষে সবাই যখন যার যার কাজে ব্যস্ত, তখন বাড়ির জন্য মনটা কেমন যেন আনচান করত। ফোনের ওপাশে বাবা-মায়ের কণ্ঠ শুনলেই মনে হতো, এখনই যদি বাড়ি ফিরতে পারতাম! কিন্তু চাইলেও পারিনি, কারণ বাড়ি যে প্রায় ষোলো ঘণ্টার পথ দূরে। তাই ছুটি এলেও বাড়ি ফেরার আনন্দ জুটত না; অপেক্ষা করতে হতো দীর্ঘ ছুটির, আর বুকের ভেতর জমে থাকত একরাশ ব্যাকুলতা।

তারপর একদিন হঠাৎ এক সহপাঠী পাশে বসে বলল, “চলো লুডু খেলি।” সেই ছোট্ট আমন্ত্রণেই যেন বদলে গেল অনেক কিছু। এরপর একে একে পরিচয় হলো আরও অনেকের সঙ্গে। সিনিয়রদের আন্তরিকতা, ক্যাফেটেরিয়ায় বসে অকারণ আড্ডা ও ক্লাস শেষে একসঙ্গে চা খেতে যাওয়া—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একটু একটু করে গড়ে তুলল আমার নতুন এক জগৎ। কখন যে সেই অচেনা ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথ, গাছের ছায়া আর ক্যাফেটেরিয়ার টেবিল আমার স্মৃতির অংশ হয়ে উঠল, টেরই পাইনি। বাড়ির প্রতি টান কখনো কমেনি, বরং তার পাশে জন্ম নিল আরেকটি টান—ক্যাম্পাসের টান।

হয়তো এটাই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন: বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে আরেকটি ছোট্ট বাড়ি খুঁজে পাওয়া। আজ সেই ক্যাম্পাস আর শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এ আমার জীবনের আরেকটি ঠিকানা।