রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

গোবিপ্রবির সবুজ ক্যাম্পাসে নবীনদের চোখে আগামীর স্বপ্ন

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

ঠিন ভর্তিযুদ্ধ শেষে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ একরের সবুজ ক্যাম্পাসে পা রেখেছে নতুন একঝাঁক প্রাণ। ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের এই নবীন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় এখন মুখর পুরো ক্যাম্পাস। সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, লেক কিংবা ক্যাফেটেরিয়া সবখানেই জমে উঠেছে তাদের নতুন আড্ডা আর উচ্ছ্বাস। ঘর ছেড়ে অচেনা পরিবেশে এলেও খুব দ্রুতই তারা এই ক্যাম্পাসকে আপন করে নিয়েছে। চোখেমুখে তাদের নতুন কিছু শেখার আগ্রহ আর বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণের স্বপ্ন। নবীন এই শিক্ষার্থীদের মনের নানা অনুভূতি, ভালো লাগা আর আগামীর প্রত্যাশার কথাগুলোই এক সুতোয় গেঁথেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তায়ীম খান

৫৫ একরের ক্যাম্পাসে আমার প্রথম পদচিহ্ন

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, “All the world’s a stage.” হয়তো তাই—জীবনের প্রতিটি নতুন জায়গাই একেকটি নতুন মঞ্চ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রবেশ ছিল আমার জীবনের তেমনই একটি নতুন দৃশ্যের শুরু। ৫৫ একর বিস্তৃত ক্যাম্পাসে প্রথম দিন পা রাখার মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, আমি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পার হচ্ছি না; পরিচিত জীবনের সীমানা অতিক্রম করে অজানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। চারপাশে অসংখ্য নতুন মুখ, নতুন ভবন, নতুন পরিবেশ—সবকিছু যেন আমাকে নীরবে প্রশ্ন করছিল, “এবার তুমি নিজেকে কতটা নতুন করে আবিষ্কার করতে পারবে?”

রবার্ট ফ্রস্টের “The Road Not Taken” কবিতাটি আমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দেয়—জীবনে কিছু পথ এমন থাকে, যেগুলো একবার বেছে নিলে আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসাটাও আমার কাছে তেমন একটি পথ। এখানে আসার পর বুঝতে পারছি, বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া নয়; নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়া, ভুল থেকে শেখা এবং অচেনা পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলাও বড় হয়ে ওঠার অংশ।

প্রথম দিনের অস্বস্তি ধীরে ধীরে পরিচিতিতে বদলেছে। অপরিচিত মুখগুলো বন্ধুত্বের গল্প হয়ে উঠছে, আর ৫৫ একরের বিশাল ক্যাম্পাসটি ধীরে ধীরে আমার স্মৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো কোনো একদিন এই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু তখনো মনে থাকবে—জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রথম বাক্যটি আমি এখানেই লিখেছিলাম। “The rest is silence”—শেক্সপিয়ারের এই কথার মতো, একদিন হয়তো সব শব্দ থেমে যাবে; কিন্তু এই ক্যাম্পাসে রেখে যাওয়া আমার পদচিহ্ন আর স্মৃতিগুলো আমার নিজের গল্পে নীরবে থেকে যাবে।
— মোসা. ফিরোজা আক্তারী, পরিসংখ্যান বিভাগ

নবীনদের পদচারণায় মুখরিত ৫৫ একর

ছোটবেলা থেকেই বুকের ভেতর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা সযত্নে লালন করে আসছি। অনেক ধৈর্য, পরিশ্রম, কঠোর অধ্যবসায় আর অবশেষে ভর্তি পরীক্ষা নামক যুদ্ধের শেষে আমার সেই স্বপ্ন আজ সত্যি হয়েছে। বর্তমানে আমি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। আমার কাছে এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি আমার অস্তিত্বের স্মারক, স্বপ্ন বপনের এক উন্মুক্ত প্রান্তর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বপ্নের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার সময় মনের ভেতর আলাদা এক শিহরণ জাগ্রত হলো। এখানকার প্রতিটি ইট, মাটি, গাছপালা যেন পরিশ্রমের ফলস্বরূপ আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ কথা, অনুজদের দিকনির্দেশনা, সহপাঠীদের সঙ্গে খুনসুটি, একসঙ্গে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা, এক ফ্রেমে ছবি তোলা—এসব আজ হৃদয়ের গভীরে স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। আমার বিভাগের শিক্ষকরা শুধু পাঠদান নয়, বরং তাঁদের আলোয় আমাদের ভবিষ্যতের রাস্তা দেখিয়ে দেন। তাঁদের মনোমুগ্ধকর অনেক কথা আমাকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করে। অতল সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে কীভাবে মূল্যবান দ্রব্যাদি খুঁজে বের করতে হয়, সেই শিক্ষা একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ই দিয়ে থাকে। আমার প্রত্যাশা, আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে একজন মানুষের মতো মানুষ হব এবং দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করব।

হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিসরে ছোট, অনেক অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। তবে আমার অনুরোধ—অবকাঠামোগত সমস্যা ও শিক্ষক স্বল্পতা দূর করে এবং প্রযুক্তির সাহায্যে আধুনিকায়ন করে সবার সামনে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে উপস্থাপন করা হোক। যাতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বাধাহীনভাবে মুক্ত জ্ঞানচর্চা করে এই বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের নাম কৃতিত্বের সঙ্গে স্বর্ণাক্ষরে লিখতে সক্ষম হয়।
— মুর্শিদা খাতুন, বাংলা বিভাগ

নতুন পথের প্রথম পদচিহ্ন

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রাখার পর মনে হলো, জীবনের একটা পরিচিত অধ্যায় শেষ হয়ে সত্যিই নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে। এত দিন যে জীবনটা শুধু বই, পরীক্ষা আর ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটার বাইরেও যে অনেক কিছু আছে, তা এখন বুঝতে পারছি। নতুন বন্ধু তৈরি হয়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, নিজের মতামত প্রকাশ করতে শেখা যায়। কখনো ক্লাসের ব্যস্ততা, কখনো আড্ডা, আবার কখনো ক্যাম্পাসের কোনো নিরিবিলি জায়গায় বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা।

এত দিন বিশ্ববিদ্যালয়কে দূর থেকে কল্পনা করেছি, আর এখন সেই ক্যাম্পাসেরই একজন শিক্ষার্থী—ভাবতেই একধরনের ভালো লাগা কাজ করে। চারপাশের নতুন মুখ, নতুন পরিবেশ, নতুন ক্লাসরুম—সবকিছুই যেন একসঙ্গে অচেনা, আবার অদ্ভুতভাবে আপন মনে হয়। নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে এসে সবচেয়ে বেশি যে অনুভূতিটা হচ্ছে, সেটা হলো স্বপ্ন আর উত্তেজনার মিশ্রণ। নতুন বন্ধু হবে, নতুন কিছু শিখব, নিজের পছন্দের বিষয়ে আরও গভীরভাবে জানব—এসব ভাবতেই ভালো লাগে।

আবার মাঝে মাঝে একটু ভয়ও হয়। অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব তো? পড়াশোনার চাপ সামলাতে পারব তো? বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন জীবনটা কেমন হবে—এসব প্রশ্নও মনে আসে। তবুও প্রত্যাশাটাই বেশি। আমি চাই, এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু একটি ডিগ্রি নয়, জীবনের অনেক মূল্যবান শিক্ষা নিয়ে বের হতে। হয়তো এই পথচলায় অনেক কঠিন সময় আসবে, কখনো মন খারাপ হবে, কখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও দ্বিধায় পড়ব। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি দিন আমাকে একটু একটু করে বদলে দেবে। আজ আমি একজন নবীন শিক্ষার্থী; কয়েক বছর পর হয়তো ফিরে তাকিয়ে দেখব—এই ক্যাম্পাসেই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর শুরু হয়েছিল।
— সুমাইয়া তাসনিম, বাংলা বিভাগ

৫৫ একরে স্বপ্নের পদচারণা

“চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল” কাজী নজরুল ইসলামের এই দুর্বার আহ্বানের মতোই জীবনের নতুন পথে এগিয়ে চলার প্রত্যয় নিয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ একরে আমার পদচারণা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পা রাখার মুহূর্তটি ছিল আনন্দ, বিস্ময় ও আবেগে ভরা। যে ক্যাম্পাসকে এত দিন দূর থেকে কল্পনা করেছি, আজ সেই ক্যাম্পাসেরই একজন শিক্ষার্থী—এই অনুভূতি সত্যিই অনন্য।

নতুন ক্যাম্পাস মানেই নতুন মানুষ, নতুন বন্ধুত্ব, নতুন অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য নতুন স্বপ্ন। চারপাশের প্রাণবন্ত পরিবেশ, সবুজের ছোঁয়া, নবীনদের উচ্ছ্বাস আর ব্যস্ত পদচারণা মনে করিয়ে দেয় জীবন আসলে প্রতিনিয়ত নতুন করে শুরু করার নাম। প্রতিটি সকাল যেন নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে, আর প্রতিটি পথচলা শেখায় সামনে এগিয়ে যেতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো”—এই প্রত্যয় নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তুলতে চাই।

আমার প্রত্যাশা, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, জীবনের বাস্তব শিক্ষা অর্জনেরও সুযোগ করে দেবে। জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই। নতুন কিছু শেখার পাশাপাশি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও পরিণত করতে চাই। নিজের স্বপ্নকে আরও বড় করে দেখার এবং তা বাস্তবায়নের সাহস অর্জন করতে চাই। জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্‌ক্তি “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” আমার এই নতুন যাত্রার সঙ্গী হয়ে থাকুক। আমার বিশ্বাস, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিন একদিন হয়ে উঠবে অসংখ্য গল্প, শিক্ষা ও স্মৃতির ভান্ডার।
— তন্নী মন্ডল, বাংলা বিভাগ

নবীনদের পদচারণায় মুখরিত ৫৫ একর

ঋতুরাজ বসন্ত যেমন শীতের জরাজীর্ণতাকে ধুয়েমুছে পৃথিবীকে নতুন করে প্রেম, রং আর প্রাণ দিতে আসে, তেমনি অপরাজেয় তারুণ্যের দুর্বার উচ্ছ্বাস, অনাগত সম্ভাবনার অদম্য আহ্বান এবং অগণিত স্বপ্নের সমাহারে আজ মুখরিত আমাদের প্রিয় ৫৫ একর। চারদিকে শুধুই নতুনত্বের সৌরভ। নবাগতদের পায়ের কোমল ছন্দে ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রান্তর যেন নবচেতনার এক অনির্বচনীয় উন্মেষ লাভ করেছে। স্থবিরতার অন্তরাল ভেদ করে সর্বত্রই প্রস্ফুটিত হচ্ছে নবসত্তার প্রতিধ্বনি। অপরিচিত মুখের সমাবেশ, কৌতূহলী দৃষ্টিতে অজানাকে জানার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আজ যেন নবচেতনার অভিষেকে স্নাত।

এই ৫৫ একর কেবলই নিছক ভৌগোলিক পরিসর বা ইট-পাথরের নিথর স্থাপত্যশৈলী নয়; এটি অসংখ্য স্বপ্নের আধার, প্রত্যাশার তীর্থভূমি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও আত্মউন্নয়নের সাধনক্ষেত্র এবং আগামী বিনির্মাণের এক সুদীর্ঘ কর্মযজ্ঞের উন্মেষভূমি। এখানকার প্রতিটি বৃক্ষ, পথ, দেয়াল, অলিগলি একদিন ধারণ করবে নবীনদের হাসি, ব্যর্থতা, প্রত্যয় ও অর্জনের স্মৃতিচিহ্ন। নবীনদের আগমনে যেন এই ৫৫ একর নতুন অলংকারে সজ্জিত হয়েছে। ব্যস্ত করিডোর, শ্রেণিকক্ষ, ক্যাম্পাসের পথ ও আড্ডার জায়গাগুলো নবীনদের হাসি-আনন্দে হয়ে উঠছে আরও প্রাণবন্ত ও মুখর।

সময়ের স্রোতে হয়তো প্রথম দিনের সংকোচ, অচেনা পরিবেশ, নতুনত্বের মোহ একদিন ম্লান হয়ে যাবে, কিন্তু এই ৫৫ একরের বুকে রেখে যাওয়া পদচিহ্ন এবং আগমনের মাহেন্দ্রক্ষণ থেকে যাবে স্মৃতির সিন্দুকে। অপরিচিত এই ৫৫ একর একদিন হয়ে উঠবে সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা। এখানেই তৈরি হবে অসংখ্য স্মৃতি ও বন্ধুত্ব, অর্জিত হবে বিদ্যা ও প্রজ্ঞা এবং ভবিষ্যতের পটে রচিত হবে এক সম্ভাবনার আখ্যান। আজ এই ৫৫ একর যেন নবীনদের নিয়ে সূচনা করল এক নতুন মহাকাব্যের।
— তিষা বাগচী, অর্থনীতি বিভাগ

শুভ্র/