মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

ঈদুল আজহা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

বিত্র ঈদুল আজহা মূলত ত্যাগ, সহমর্মিতা ও পরম সম্প্রীতির এক মহিমান্বিত উৎসব। ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের সমান্তরালে নিরাপদ ঈদযাত্রা, সুপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে যৌথ কোরবানির মতো নানাবিধ প্রাসঙ্গিক বিষয় আজ তরুণ শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। আসন্ন ঈদকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আনন্দময় করে তুলতে তরুণ প্রজন্মের তেমনই কিছু সচেতন ও মননশীল ভাবনা সংকলন করেছেন আমানুর রহমান।

​নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হোক ঈদযাত্রা
— বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার।

​ঈদ মানেই আনন্দ; ঈদ মানেই নাড়ির টানে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়া। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা অনেক সময় রূপ নেয় মারাত্মক দুর্ভোগ ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায়। ঘরমুখো মানুষের অতিরিক্ত চাপ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি ও অসচেতনতা সড়কে ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ক্লান্ত চালকের দীর্ঘসময় ধরে গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। একটি নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে চালক ও পথচারী—উভয়েরই সচেতনতা জরুরি। চালকদের অবশ্যই নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলতে হবে, ওভারটেকিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। অন্যদিকে, পথচারীদেরও ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও উচিত ফিটনেসবিহীন কিংবা অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই যানবাহনে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মহাসড়কে বাড়তি টহল, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীসেবামূলক কার্যক্রম দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। সবার সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে ঈদের আনন্দযাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে। নিরাপদ ও নির্ভাবনার ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র।

​মূল্যস্ফীতির চাপে মধ্যবিত্তের ভরসা যৌথ কোরবানি
— সাব্বির হোসাইন
শিক্ষার্থী, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।

​লাগামহীন মূল্যস্ফীতি আর নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবন আজ চরম সংকটের মুখোমুখি। অর্থনৈতিক এই তীব্র টানাপোড়েনের কারণে এককভাবে কোরবানি দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য হারাচ্ছেন সমাজের সিংহভাগ মধ্যবিত্ত। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতিও মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছেদ্য ইবাদত এবং ত্যাগের চিরন্তন মহিমা থেকে তাঁদের দূরে সরাতে পারেনি। ধর্মীয় আবেগ ও বিধান পালনের এই ধারাকে সচল রাখতে বর্তমান সময়ে তাঁদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ‘যৌথ কোরবানি’। বিত্তবানরা এককভাবে কোরবানি দিলেও, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন পরম উৎসাহে ভাগে বা যৌথভাবে পশু উৎসর্গ করার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। হাটে গিয়ে একসঙ্গে পশু নির্বাচন করা থেকে শুরু করে ঈদের দিন আনন্দ ভাগাভাগি ও মাংস বণ্টন—প্রতিটি পদক্ষেপেই জড়িয়ে আছে এক অনন্য মানবিক মেলবন্ধন। এই যৌথ কোরবানি কেবল মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপই কমাচ্ছে না, বরং সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সহানুভূতি ও গভীর सहমর্মিতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে সংকটের মাঝেও ত্যাগের মহিমায় সামাজিক ঐক্য ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হয়ে উঠছে।

​ত্যাগের প্রকৃত মহিমা বনাম সামাজিক প্রদর্শনের মানসিকতা
— নুসরাত জাহান জেরিন
শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

​পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানি নিছক কোনো পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও হৃদয়ের তাকওয়ার এক পরম নিদর্শন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে কোরবানির এই পবিত্র উদ্দেশ্যকে আড়াল করে সমাজে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম হয়েছে। কে কত বড় বা দামি পশু কিনল, তা প্রদর্শনের অহমিকা আমাদের আত্মশুদ্ধির মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। লোকদেখানো এই আড়ম্বর আর সামাজিক মর্যাদার বড়াই কখনোই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। ​কোরবানির আসল মহিমা লুকিয়ে আছে বিশুদ্ধ নিয়ত আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের মাঝে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করে তার মাংস যখন আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অসহায় দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, তখনই সমাজে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়। তাই সামাজিক প্রতিযোগিতার বৃথা আস্ফালন থেকে বেরিয়ে এসে কোরবানির ধর্মীয় ও মানবিক শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ, মহান আল্লাহর দরবারে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল আমাদের অন্তরের তাকওয়া ও বিশুদ্ধ নিয়ত।

​উৎসবের আনন্দ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
— মোঃ মাজহারুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

​ঈদুল আজহার দিনে পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। ঘরে ঘরে আনন্দ, কোলাহল আর কোরবানির ব্যস্ততা। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই রাস্তার পাশে কিংবা খোলা জায়গায় জমতে থাকে পশুর রক্ত আর বর্জ্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ; উৎসবের পবিত্র আবহ ম্লান হয়ে যায় অস্বস্তিকর এক বাস্তবতায়। অথচ সামান্য সচেতন হলেই এই অপ্রীতিকর সমস্যা এড়ানো সম্ভব। ​নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবাই করা, বর্জ্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখা এবং জবাইয়ের পর দ্রুত চারপাশ পরিষ্কার করা—এটুকু নিশ্চিত করলেই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনকেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমাদের চারপাশ থাকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। এই দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের নয়, আমাদের প্রত্যেকের। নিজের আশপাশটুকু পরিষ্কার রাখাই হোক এবারের ঈদে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

​চামড়াশিল্পে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব
— ফাহীমা আক্তার
শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা।

​বাংলাদেশের চামড়াশিল্প দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় বিপুল পরিমাণ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। তবে এ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনে অধিক মুনাফা লুটে নেয়। যার দরুন প্রকৃত সংগ্রাহকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের চামড়াশিল্প। ​চামড়া খাতের সকল সমস্যা সমাধান ও যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে এই শিল্পকে সঠিকভাবে দাঁড় করানো গেলে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এতে দেশের শ্রমবাজারের ওপর চাপ কমবে এবং বেকারত্ব সংকট অনেকাংশে দূর হবে। তাই সরকারকে ঈদুল আজহার পূর্বেই এই সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কথায় আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’। সময়মতো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত ও গৃহীত পদক্ষেপের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হলে এবারও গত বছরের লোকসানের পুনরাবৃত্তি ঘটবে; যার খেসারত দিতে হবে দেশের প্রান্তিক চামড়া ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে।

​ঈদে খাবারে স্বাস্থ্য সচেতনতা
— শেখ মেহেদী হাসান
শিক্ষার্থী, গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা।

​আত্মত্যাগ, মানবতা ও বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র কোরবানির ঈদ। এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিটি ঘরে ঘরে মাংস আহারের এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। তবে আনন্দের আতিশয্যে অনেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি ভুলে যান, যা পরবর্তী সময়ে নানা শারীরিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ​প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে মাংসের যথেষ্ট পুষ্টিগুণ থাকলেও, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাংস খেলে বদহজম, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, এমনকি পেপটিক আলসারের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ও মধ্যবয়সী ব্যক্তি—যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত মাংস খাওয়া হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই উৎসবের আনন্দকে অম্লান রাখতে পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য। সঠিক খাদ্য সচেতনতা আর পরিমিতিবোধই পারে কোরবানির ঈদকে সবার জন্য আরও আনন্দদায়ক ও সুরক্ষিত করে তুলতে।

শুভ্র/