বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির বিদায় যেন একটি অসাধারণ যুগের সমাপ্তি। বাংলাদেশেও তার বিদায় গভীর আবেগের শূন্যতা তৈরি করেছে, বিশেষ করে এমন এক প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে, যারা মেসির জাদুকরী বাঁ পা, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং এবং সাফল্যের জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয়ে বেড়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক ফুটবলার জাহিদ হাসান এমেলিও তাদেরই একজন। মেসি ও আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ সমর্থক এমেলি মনে করেন, ফুটবলে আর্জেন্টাইন এই সুপারস্টারের জায়গা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
বাসস’র সাথে একান্ত আলাপে এমেলি বলেন, “আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। তাকে আর আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে দেখব না, এটা আমি কল্পনাই করতে পারছি না। এটি আমার জন্য খুবই আবেগঘন ও বেদনাদায়ক মুহূর্ত। তিনি আর আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলবেন না, এই সত্যটি আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।”
আজ সকালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন মেসি। বুয়েনস আয়ার্সে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করেন এবং দুটি গোলে সহায়তা করেন মেসি।
এত উচ্চমানের পারফরম্যান্স ধরে রাখার সময়ে মেসির আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়াটা মুহূর্তটিকে আরও কঠিন করে তুলেছে এমেলির কাছে।
তিনি বলেন, “বেনিনের বিপক্ষে তিনি একটি গোল করেছেন এবং দুটি গোলে সহায়তা করেছেন। এত দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অবস্থায় তাকে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে দেখা একজন ফুটবলার হিসেবে আমার জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।”
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় মেসিকে রাখতে এমেলির কোনো দ্বিধা নেই।
তিনি বলেন, “একজন ফুটবলারের কাছ থেকে যতটা প্রত্যাশা করা হয়, মেসি তার চেয়েও অনেক বেশি অর্জন করেছেন। তিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলার। অন্য কারও সঙ্গে তার তুলনা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।”
মেসির খেলার কোন দিকটি তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে এমেলি তার ড্রিবলিংয়ের কথা উল্লেখ করেন, “মেসি অসংখ্য গুণে সমৃদ্ধ একজন ফুটবলার। আমার মনে হয় না, অন্য কোনো খেলোয়াড় মাঠে এতগুলো ভিন্ন গুণ একসঙ্গে তুলে ধরতে পারেন। তবে যদি একটি বিষয় আলাদা করে বলতে হয়, তাহলে আমি বলব তার ড্রিবলিং একেবারেই অসাধারণ।”
তবে এমেলির কাছে মেসির শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার কারিগরি দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মানসিক দৃঢ়তাই তাকে অন্যদের থেকে সত্যিকার অর্থে আলাদা করেছে।
তিনি বলেন, “মেসির মানসিক দৃঢ়তাই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে।” এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের কথাও স্মরণ করেন।
মেসি অসংখ্য সাফল্য অর্জন করলেও তার বিনয়ও এমেলিকে মুগ্ধ কওে, “মেসি খুবই বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি যেভাবে খেলেন, তা হয়তো আর কেউ কখনো অনুকরণ করতে পারবেন না। কিন্তু আমার কাছে সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত একজন ফুটবলারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো তার বিনয়।”
“আমি বিশ্বাস করি, আমাদের তরুণ ফুটবলাররা মেসির কাছ থেকে এই বিষয়টি শিখতে পাওে, ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেও কীভাবে বিনয়ী থাকতে হয়।”
মেসির অনুপস্থিতিতে এমন একটি শূন্যতা তৈরি হবে, যা অন্য কোনো খেলোয়াড় পূরণ করতে পারবেন না বলেও মনে করেন এমেলি।
তিনি বলেন, “কে তাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে, এমন প্রশ্ন আসা উচিত বলে আমি মনে করি না। মেসির কাছাকাছি যেতে পারে এমন কোনো খেলোয়াড় আমি দেখি না এবং আমার বিশ্বাস, তিনি যে শূন্যতা রেখে যাবেন, তা কখনোই কেউ পূরণ করতে পারবে না।”
এমেলির মতে, মেসির জনপ্রিয়তা শুধু ফুটবল মাঠ বা আর্জেন্টিনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ প্রসঙ্গে এমেলি বলেন, “মেসি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমি মেসিকে মিস করব এবং আমার বিশ্বাস, পুরো বিশ্বও তাকে মিস করবে।”
মেসির সঙ্গে কখনো খেলার সুযোগ পেলে তার কাছ থেকে কী শিখতে চাইবেন এমন প্রশ্নে কিছুটা মজার উত্তর দেন এমেলি, “সম্ভবত প্রথমেই আমি তার সঙ্গে একটি ছবি তুলতে চাইব। কারণ, মেসি মাঠে যা করেন, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি অবিশ্বাস্য রকম কঠিন।”
তবে এমেলির কাছে সেই সাধারণ একটি ছবির অর্থ আরও অনেক বড়। এটি হবে এমন একজন খেলোয়াড়ের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, যার প্রভাব প্রজন্ম ও দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে কোটি ভক্তের হৃদয়ে।
মেসির তুলনা শুধু মেসিই, যাকে কোনকিছুর বিনিময়ে কখনই ভুলতে চায়না পুরো ফুটবল বিশ্ব। যে লিগ্যাসি মেসি ফুটবলের মাঠে রেখে যাচ্ছেন তা পরবর্তী প্রজন্ম কতটুকু সামনে এগিয়ে নিতে পারেন সেটাই এখন অপেক্ষার। যদিও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মেসিদের মত অতি অসাধারন প্রতিভাবানরা আসবেই, তার কোনও গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা। মেসিরা বিদায় নেয় ঠিকই, কিন্তু কোটি ভক্তের হৃদয়ে তারা যে স্থান করে নেয় তার রেশ থেকে যায় আজীবন।
