মাহমুদা মহিউদ্দীন দিশা:
বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার প্রথম কয়েকটা দিন কেবল নতুন ক্লাসরুম আর অচেনা মুখের সঙ্গে পরিচয়ের দিন ছিল না, সেটি ছিল নানা সংস্কৃতির সঙ্গে এক নীরব অভিযাত্রার শুরু। উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা সহপাঠীদের কথা, আচরণ আর দৃষ্টিভঙ্গিতে মিশে আছে প্রত্যেকের নিজস্ব রং। স্কুল কলেজে থাকতে ছোট্ট একটা ইচ্ছা ছিল, আমারও একজন পাহাড়ি বা আদিবাসী বন্ধু হোক। তখন সেটা হয়নি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করেছে।
আজ আমার এক সহপাঠী মারমা সম্প্রদায়ের মেয়ে। ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে ভাবি, খাগড়াছড়িতে ওর দিনগুলো কেমন কাটে। আবার যে ছেলেটার বাড়ি কক্সবাজার, তাকে দেখে ভাবি, তার প্রতিদিনের জীবনে না জানি সমুদ্র কত সুন্দর হয়ে মিশে আছে। উত্তরবঙ্গের সহপাঠীদের বাচনভঙ্গি, চিন্তাধারা আর চলাফেরা যে আমার থেকে বেশ আলাদা, সেটিও এখানে এসে খেয়াল করলাম।
আমার বাড়ি যশোর জেলায়, যে অঞ্চলের ভাষাকে অনেকেই প্রমিত বাংলার কাছাকাছি মনে করেন। তবু কিছুটা কষ্টের সঙ্গেই বলতে হচ্ছে, এই সংস্কৃতির সমুদ্রে এসে ভাষার কারণে আমিও কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়েছি। তবে অবাক হয়ে আর খুশি হয়ে দেখলাম, সহপাঠীদের মধ্যে আমার নিজের জেলার মানুষও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। ভাষা আর সংস্কৃতির ভিন্নতা যে মানুষকে এতটা মুগ্ধ করতে পারে, তা এই ক্যাম্পাসে না এলে হয়তো বুঝতামই না।
এখানে রয়েছে কত শত ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি আর জীবনযাত্রার রং। অভিযোজনের গল্প আসলে শুরু হয় তখনই, যখন আমরা এই ভিন্নতাকে আড়াল না করে ভালোবেসে গ্রহণ করতে শিখি। বন্ধুদের আঞ্চলিক ভাষার মিষ্টি শব্দগুলো নিজে বলার চেষ্টা করতে গিয়েই যেন জমে ওঠে ক্যাম্পাসজীবন। সংস্কৃতির এই আদান প্রদান শুধু নতুন বন্ধুত্বের জন্ম দেয় না, ক্যাম্পাসের পরিবেশকেও করে তোলে আরও প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ। সব ভিন্নতাকে মেনে নিয়ে একসঙ্গে পথ চলার এই অভিজ্ঞতা আমাদের আগামী দিনের জীবনকেও করবে আরও উদার ও সমৃদ্ধ।
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ (১ম বর্ষ)
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
