বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম উচ্চারণ করলেই পাঠকের মনে প্রথমে ভেসে ওঠে রসিকতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অনন্য ভঙ্গির এক লেখকের ছবি। রম্যরচনায় তাঁর খ্যাতি সবচেয়ে বেশি হলেও তাঁর সাহিত্যজগৎ কেবল হাস্যরসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভ্রমণ, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ভাষাচর্চায়ও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র কৃতিত্ব।
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলা সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক লেখকের জন্মদিন। ১৯০৪ সালের এই দিনে সিলেটের করিমগঞ্জে, তাঁর বাবার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল হবিগঞ্জের উত্তরসুর গ্রামে।
বাবার চাকরির সুবাদে শৈশবে বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেন মুজতবা আলী। পরে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হয়ে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন এবং ১৯২৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্বভারতীতে পড়ার সময়ই তাঁর সামনে খুলে যায় নানা ভাষা ও সংস্কৃতির জগৎ। সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ফারসি, আরবি, রুশ, ইতালীয়, উর্দু, হিন্দি ও গুজরাটিসহ বহু ভাষায় তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।
কর্মজীবনও ছিল তাঁর মতোই বৈচিত্র্যময়। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে ফরাসি ও ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন। পরে বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক, বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাসের খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেছেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতেও। জীবনের শেষ পর্যায়ে বিশ্বভারতীর ইসলামের ইতিহাস বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে অবসর নেন।
তাঁর সাহিত্যেও ছড়িয়ে আছে সেই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ছাপ। ‘দেশে-বিদেশে’, ‘জলে-ডাঙায়’, ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’, ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘চাচা-কাহিনী’ ও ‘টুনি মেম’সহ নানা গ্রন্থে কখনো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, কখনো মানুষের জীবন, আবার কখনো সমাজের নানা অসঙ্গতি উঠে এসেছে নিজস্ব রসবোধে।
তবে মুজতবা আলীর লেখার হাসির আড়ালেও ছিল গভীর মানবিকতা। তাঁর গল্প-উপন্যাসে মানুষের দুঃখ, বেদনা, অপূর্ণতা ও জীবনসংগ্রাম যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। নানা দেশ ভ্রমণ, বিচিত্র মানুষের সান্নিধ্য এবং কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।
পাঠকের মুখে মুখে ফেরে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না।’ বই ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ যেন এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৯ সালে তিনি নরসিং দাস পুরস্কার এবং ১৯৬১ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই বহুভাষী, বহুমাত্রিক ও অনন্য রসবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক।
তাঁর লেখা আজও পাঠককে হাসায়, ভাবায় এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। এ কারণেই সময় পেরিয়েও সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র এক নাম।
শুভ্র/
