শিল্প সাহিত্যের আঙিনায় তিনি ছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা। একদিকে তাঁর কলমের নিখুঁত আঁচড়ে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে অসাধারণ সব কালজয়ী উপন্যাস, অন্যদিকে সেলুলয়েডের ফিতায় তিনি নিখুঁতভাবে বন্দি করেছেন বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদের ভাষা। তিনি আর কেউ নন, আমাদের গর্বের ধন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা ও বরেণ্য ঔপন্যাসিক জহির রায়হান। আজ এই মহান সৃজনশীল মানুষের জন্মদিন। ১৯৩৫ সালের এই দিনে ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ।
জহির রায়হানের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল গভীর দেশপ্রেম ও প্রতিবাদী সত্তা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সময় যে অকুতোভয় দশজনের দলটি প্রথম ১৪৪ ধারা ভেঙেছিল, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদেরই একজন। ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। জাতির প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে তিনি শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে সর্বদা রাজপথে ছিলেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে জহির রায়হান ছিলেন একজন প্রকৃত জাদুকর। তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় তৎকালীন চলচ্চিত্র শিল্প নতুন এক মাত্রা পেয়েছিল। ১৯৫৭ সালে উর্দু ভাষার ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’র সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের পথচলা শুরু হয়। এরপর ১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’। ঠিক পরের বছর ১৯৬৫ সালে তাঁর হাত ধরে মুক্তি পায় প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’। তবে তাঁর নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি বাঙালি প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে আজও এক তুমুল আলোড়ন তোলা নাম। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবি আজও দর্শকরা প্রবল মুগ্ধতা নিয়ে উপভোগ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নির্মিত অনবদ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিশ্ববিবেকের কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিল।
ক্যামেরার পেছনের জাদুকরী ভূমিকার পাশাপাশি সাহিত্যের জগতেও জহির রায়হান ছিলেন সমান উজ্জ্বল ও প্রভাবশালী। তাঁর রচিত ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ এবং ‘বরফ গলা নদী’র মতো উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে চিরকালের জন্য। এছাড়া তাঁর লেখা ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নামক ছোটগল্পটিও পাঠকমহলে আজও বিপুল সমাদৃত। শিল্প ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই গুণী ব্যক্তিত্বকে নিগার চলচ্চিত্র পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং মরণোত্তর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে এই ক্ষণজন্মা প্রতিভাকে বেশিদিন কাছে পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে আলবদর বাহিনী তাঁর বড় ভাই বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করে। নিখোঁজ ভাইকে খুঁজতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ছুটে যান জহির রায়হান। কিন্তু সেখান থেকেই তিনি চিরতরে হারিয়ে যান। এরপর আর কখনোই তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। জহির রায়হান সশরীরে আমাদের মাঝে নেই সত্যি, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীল কাজগুলো আজও প্রতিটি বাঙালির মনে স্বাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রদীপ্ত করে চলেছে। আগামী দিনের সৃজনশীল সমাজ বিনির্মাণে জহির রায়হান চিরকাল এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবেন।
