সারাদেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এবারের নির্বাচনে একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে তরুণ ভোটার, যারা প্রথমবারের মতো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি গণভোট নিয়ে ভোটারদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নতুন সরকার ও আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থী…
গণভোট ও নির্বাচনে তরুণদের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক
মোঃ মিজানুর রহমান
শিক্ষার্থী, সরকারি ইস্পাহানী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কেরানীগঞ্জ
প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতি এক কথায় চমৎকার ও অসাধারণ। আলহামদুলিল্লাহ, খুব শান্ত, সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে আনন্দের সাথে ভোট দিতে পেরেছি।
আমার দৃষ্টিতে এই নির্বাচন ও গণভোটের প্রেক্ষাপট বেশ উৎসবমুখর। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে সবার মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করেছি। তবে গণভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে—কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, আবার কেউ ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলছেন। যদিও একই দিনে দুটি ভোট হওয়ায় কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, তেমনটি চোখে পড়েনি। তবে ঢাকা-৫ আসনের ডেমরা থানার কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখেছি, অন্যান্য বয়সের তুলনায় তরুণ ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। যেহেতু বিতর্কিত নির্বাচনের পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে, তাই সরকারের উচিত ছিল এ নিয়ে আরও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো, যাতে জনমনে ভয়ভীতি দূর হতো।
নতুন যেই সরকার গঠন করুক, তাদের স্বাগত জানাই। নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে, সরকার যেন সাধারণ জনগণের মতামতের গুরুত্ব দেয়। সুশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়াই হোক লক্ষ্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন এবং শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরির দাবি জানাচ্ছি। মাদক, ধর্ষণ ও সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হবে—এটাই প্রত্যাশা।
জুলাইয়ের সাহসী যোদ্ধাদের কারণেই এই অধিকার ফিরে পেয়েছি
ফারনাজ মুক্তা
শিক্ষার্থী, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ
রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে এটি ছিল আমার প্রথম ভোট। স্বাধীনভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারার সুখ ও গর্ব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিগত সময়ে আমার মা যখন কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন, তখন চোখের সামনে ভোট চুরির যে দৃশ্য এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা দেখেছি, তা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। দীর্ঘ বঞ্চনার পর আজ নাগরিক অধিকার ফিরে পেয়েছি, যা সম্ভব হয়েছে জুলাইয়ের সাহসী যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আমি আগামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চাবিকাঠি বলে মনে করি। আমি আশাবাদী যে, এর মাধ্যমে আধিপত্যবাদবিরোধী, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশ গঠিত হবে।
নতুন সরকারের কাছে আমার প্রধান প্রত্যাশা হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করলে দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী উদ্যোক্তা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন জরুরি। সর্বোপরি, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
আঙুলের কালির দাগ শুধু চিহ্ন নয়, গর্বের স্মারক
আশিক বিন আলম সোহাগ
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ
প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার অনুভূতিটি ছিল আমার কাছে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ এবং শিহরণ জাগানিয়া। ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ কাজ করছিল। নিজের ভোট নিজে দিয়ে অনুধাবন করলাম, গণতন্ত্রের মূল শক্তি আসলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হাতেই ন্যস্ত।
আমি মনে করি, আঙুলের সেই অমোচনীয় কালির চিহ্নটি শুধু একটি দাগ নয়, বরং সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি আমার গর্বের স্মারক। নতুন সরকারের কাছে আমার চাওয়া, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর দৃশ্যমান পদক্ষেপ যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। জনকল্যাণে তাদের গৃহীত উদ্যোগগুলো যেন জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়ক হয়—এমনটাই প্রত্যাশা।

প্রত্যাশা শুধুই দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও জীবনের নিরাপত্তা
রুহুল আমিন
শিক্ষার্থী,সরকারি আকবর আলী কলেজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় এবং প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। প্রশাসনের সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ভোটের পরিবেশ ও শালীনতা বজায় রেখেছেন, যা প্রশংসনীয়।
এমন সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ দেখে আমাদের সকলের প্রত্যাশা, সরকার যে-ই নির্বাচিত হোক না কেন, দেশে যেন সবসময় এমন সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকে। আমরা আমাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে যে সরকার নির্বাচন করছি, তাদের কাছে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের একটাই জোরালো দাবি—তারা যেন আমাদের একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দেন।
বারবার আশাহত হতে চাই না, চাই নিরাপত্তা ও শান্তি
শাম্মী তুলতুল
লেখক ও কথাসাহিত্যিক
এবারের নির্বাচনে আমি প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করলাম। আমার কেন্দ্রে কোনো অশান্তি বা অরাজকতা দেখিনি; বরং বেশ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোট দিয়েছি।
এই নির্বাচন ও গণভোটের প্রেক্ষাপটকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই দেখছি। সামনে খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে, তবে শর্ত হলো—যাঁরা জয়ী হবেন, তাঁরা যদি আসলেই দেশের মঙ্গলের কথা ভাবেন। বারবার আমরা আশাহত হয়েছি, তাই নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। যারা দেশ চালাবেন, তারা যেন আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং দেশকে শান্ত রাখেন। আমরা আর মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি দেখতে চাই না।
শাসক নয়, জনগণের সেবক সরকার প্রয়োজন
মেহেদী হাসান জয়
শিক্ষার্থী, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর
আলহামদুলিল্লাহ, জীবনে প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই ভালো লাগার মতো ছিল। শুরুতে একটু নার্ভাস লাগলেও, ভোট দেয়ার পর এক ধরণের গর্ব ও দায়িত্ববোধ অনুভব করেছি। মনে হচ্ছিল, আমিও দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার একজন গর্বিত অংশীদার।
এই নির্বাচন ও গণভোটের প্রেক্ষাপট আমার কাছে অত্যন্ত সময়োপযোগী মনে হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার জন্য একটি নির্বাচিত সরকার এবং সঠিক দিকনির্দেশনা খুবই প্রয়োজন ছিল। আমি আশাবাদী, এই গণভোটের মাধ্যমেই সেই কাঙ্ক্ষিত দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত হবে। নতুন সরকারের কাছে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা—তারা যেন শাসক নয়, বরং জনগণের সেবক হয়ে কাজ করেন। অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতার পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়াই হোক তাদের একমাত্র অঙ্গীকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নতুন অধ্যায়। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোর পর অর্জিত এই ভোটাধিকার তাদের কাছে পবিত্র আমানতস্বরূপ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই তরুণ শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দুর্নীতিমুক্ত, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তাদের কালিমামাখা আঙুল শুধু ভোট দেওয়ার চিহ্ন নয়, এটি একটি শপথ—ন্যায়বিচার ও সুশাসনের পক্ষে থাকার শপথ। নির্বাচিত সরকার যদি তরুণদের এই আবেগকে সম্মান জানিয়ে ‘শাসক নয়, সেবক’ হয়ে দেশ পরিচালনা করে, তবেই সার্থক হবে এই নির্বাচন, সার্থক হবে তাদের প্রথম ভোট। তারুণ্যের এই প্রত্যাশা পূরণই হোক আগামীর পথচলার পাথেয়।
/শুভ্র
